শীতের দুপুর : সে ছিল দিনের সেরা বিনোদনের সময়

   

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

অন্য কোন ডাকে না বেরলেও শীতের দুপুর আর তার মিহি রোদের আহ্বানে মানুষ জড়তা কাটিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। এসময় রোদ্দুর তো নয়, যেন এক মায়াবী আলো। তাতে আছে উষ্ণতার আরাম আর গায়ে লেগে থাকা মায়া। মায়াটাই বেশি। রোদের এই উষ্ণতাটুকু অতি মহার্ঘ্য মনে হয়, তাই তাকে যতটা সম্ভব গায়ে মেখে নেবার আয়োজন আর আহ্বান থাকলে কে আর ছড়তে চায়!

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেককিছুই অন্যরকম হয়ে যায়। শীত অনেকটা পলিউটেড এখন । সুনীল আকাশ ভরা সেই স্বচ্ছ শীত আর বেশি যেমন নেই, সে সময় বা উৎসাহও তেমন নেই। সবার সুযোগও হয়তো নেই তা উপভোগ করার। কিন্তু যখন ছিল, সে ছিল এক অদ্ভুত ভালোলাগা। ছোট বড় সবার জন্যই। তখন নিরুদ্বিগ্ন শীতের দুপুরগুলো ছোটদেরকে হ্যামলিনের বাঁশির মত বের করে আনত ঘর থেকে।, ছুটোছুটি, খেলা আর হুটোপুটি চলত ঘরের উঠোনে, পাশের মাঠে, রাস্তায় যেখানে সুযোগ আর সঙ্গী জুটে যেত, সেখানেই। বছরের শেষ পরীক্ষাটি হয়ে যাওয়ার পরে পড়াশুনোর চাপ থাকতনা কিছু। এমনিতেও তখন এখনকার মত চাপ ছিলও না। তাই শীতকালটা বিশেষ করে দুপুরগুলো  হয়ে উঠত লাট্টু, মার্বেল, ডাং গুলি ইত্যাদি খেলা আর ঘুড়ি ওড়ানোর শ্রেষ্ঠ সময়। বড়দের শাসন এড়িয়ে যারা তা করতে পারতোনা তাদের কথা আলাদা, কিন্তু যারা পারতো, আনন্দ আর হুল্লোড়ে মেতে থাকতে থাকতে দুপুরের মিষ্টি রোদ কখন যে উঠোন পেরিয়ে পাশের বাড়ি পেরিয়ে বিকেলের লম্বা ছায়ায় ঢেকে দিত চরাচর তা খেয়ালই থাকতনা কারও।

বাড়ির বড়দের কাছেও সে ছিল সে এক আলসেমির সময়। পুরোটা যদিও আলসেমির ঠিক নয়। কুয়াশা মাখানো ঠাণ্ডার কনকনে সকাল থেকে দুপুর অব্দি সংসারের ঝক্কিগুলো সামলে নিয়ে, সবাইকার খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে মা কাকিমা ঠাকুমা রা যখন নিজেদের জন্য একটু সময় পেত, তখনই গিয়ে বসত দুপুরের মিষ্টি রোদে, তা সে বারান্দাতেই হোক বা উঠোনে। তখনো একটু উঠোন পাওয়া যেত, উঠোনের প্রান্তে পাঁচিল কোলে ফুটে থাকত কিছু গাঁদা আর ডালিয়া। সেই উঠোনে রোদ্দুর ছিল, সেই রোদ্দুরে মায়া ছিল। দুপুরবেলার মজলিসটা বসত সেখানেই। চলত গল্প, হাসি ঠাট্টা, আলোচনা, সমালোচনা সব। কিছু গোপন কথা থাকলে সেগুলিও চুপিচুপি সেরে নেওয়া যেত তখন। শীতের দুপুরের রোদে বসে কিছুটা আলসেমি, কিছুটা গল্পগাছা করার পাশাপাশি কেউ কেউ নিঃশব্দে এগিয়ে রাখত কিছু কিছু কাজও। সেগুলি যতটা না দরকারি, তার চেয়েও বেশি নেশার, ভালোবাসার। তাতে লেগে থাকত মায়া মমতার ছোঁয়া। শীতের দুপুরে রোদের দিকে পিঠ করে বসে মা কাকিমা বা পরিবারের অন্য মহিলারা কেউ গল্প করছে আর কেউ কেউ তারই মধ্যে, সোয়েটার বুনছে বা কাঁথা সেলাই করে যাচ্ছে এমন দৃশ্য তো সবারই চেনা। এমনকি তাস খেলাও চলতো তাদের মধ্যে। আর সবকিছুর নেপথ্যে চলত রেডিও শোনা। কাঠের পিঁড়ির উপর বা  চাটাই বা শতরঞ্চির উপর রাখা ট্রানজিস্টার রেডিও সেটটি থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলির দিকেও থাকত সমান মনোযোগ। তা সে অনুরোধের আসরের গানই হোক বা নাটক। আসলে ঐ সময়টুকুই ছিল দিনের সেরা বিনোদন। রেডিও তখন বাঙালির জীবনে মননে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। রোমান্টিক ভাবনাগুলিকে অতি যত্নে প্রতিপালন করে চলার একমাত্র মাধ্যমই তখন রেডিয়োর নানা অনুষ্ঠান। তখনো টিভি নেই, তার সিরিয়াল নেই। তাই রেডিও নাটকগুলি কল্পনার বিস্তার ঘটাতে পারত অপরিসীম। যে যার মত করে চিনে নিত জীবনের এক একরকম মানে। শীতের দুপুরে আনমনা রোদের আড্ডায় এই সবগুলি হয়ে উঠতো মনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী খোরাক।

তারপর আস্তে আস্তে রোদ সরে গেলে বসার জায়গাটিকেও যতটা সম্ভব সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বসা হত আবার। হয়তো তা চলে যেত পাঁচিলের ধার ঘেঁসে খিড়কি দরজা পর্যন্ত। এমনিতে শীত ঋতুটাই বেশিদিনের নয়, তার উপর শীতের দুপুরের রোদ আরও ক্ষণস্থায়ী। একটুক্ষণের জন্য উষ্ণতা দিয়ে সরে সরে পালিয়ে যেতে চায় দ্রুত। এই সময়টুকুর মধ্যেই তার সমস্ত মাধুর্যকে নিজের শরীরে মেখে কনকনে ঠাণ্ডায় মনটাকে একটু তাতিয়ে নিয়ে বাকি সময়ের জন্য এনার্জি সঞ্চয় করে নিত মা কাকিমারা। ইতিমধ্যেই কাউকে উঠে যেতে হত কারণ বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটিকে বিকেলের চা দিতে হবে। কেউ বা উৎসুক মন নিয়ে আর একটু অপেক্ষায় থাকত, হয়তো বিকেলের ডাকে তার চিঠি আসবে। তারপর  একসময় রোদের উত্তাপকে গিলে নিয়ে বিকেলের লম্বা ছায়া সরে গিয়ে ঝুপ করে নেমে আসত সেদিনের মত আড্ডা শেষের সময়।

এখনও আসে শীতের দুপুর, মিষ্টি রোদ্দুরের মায়া নিয়ে।  যে যার মত করে হয়তো বেরিয়েও পড়েন কাছে কিম্বা দূরে, নিজেদের মত করে আনন্দ উপভোগ করেন তাঁরা। কিন্তু সেদিনের সেই জমাটি ঘরোয়া আড্ডাগুলি যে সোনালি মুহূর্তের জন্ম দিত সেরকমটি বোধ হয় আর হয়না। এখন সময় বড় কম মানুষের হাতে। আসলে সময় আর সংসারের নানান টানাপোড়েনে সেই মনটাও হয়তো আর নেই।


Facebook Comments