যুবদিবস – যা হতে পারে এক অন্তহীন অর্জন

   

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

‘’এ যৌবন-জলতরঙ্গ রোধিবে কে?’’  যৌবনের জয়গান গাওয়া হয়েছে – সে তো আজকে নয়। যৌবনই তো জীবনের সেই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আর শ্রেষ্ঠ সময় যার জন্য মনে হয় জীবন সত্যি সত্যি জীবন্ত, সমাজ সংসার বাস্তবিকই আপন উচ্ছলতায় চলমান, সতেজ। এরকম উজ্জ্বল উচ্ছল, প্রেমে বিরহে পাগল, আনন্দে বেদনায় বিহ্বল, ক্রোধে উন্মাদনায় সাফল্যে ব্যর্থতায় ভরপুর আর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল – এরকম জীবন তো তরুণ যুবা বয়সেই সম্ভব। সেই বয়সের জয়গান গেয়ে তরুণ যুবকদের জন্য একটি পুরো দিবস পালন তাও আবার স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনটিতে – এ এক অপূর্ব মণিকাঞ্চন যোগ।

বিবেকানন্দ তো তাই চেয়েছিলেন – তরুণ যুবকদের চিন্তার উন্মেষ হোক। তারাই পারে জীবনের চাকাকে ঠিকপথে চালিত করতে। তিনি তো যৌবনেরই জয়গান গেয়েছিলেন। বলেছিলেন – “……তোমরা ঈশ্বরের সন্তান, অমৃতের অধিকারী – পবিত্র ও পূর্ণ……।” ব্যর্থতা হতাশার অন্ধকার শেষ কথা নয়, নিরাশ না হয়ে আপন সংকল্পে স্থির থেকে অগ্রসর হতে থাকলে আলো আসবেই – এই ভরসা তো তিনিই দিয়েছিলেন তরুণ যুবকদের। সমস্ত রকম গোঁড়ামি আর কুসংস্কারের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে মুক্তমনে মানুষের সেবা করাই তো ছিল তাঁর আহ্বান। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় যুব দিবস খুবই তাৎপর্যের। যুবকরাই তো পারে তাঁর চিন্তা ও আদর্শের সার্থক রূপ দিতে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে, দিনটির গুরুত্বকে মনে রেখে যৌবনের অনন্ত প্রাণশক্তি যদি জীবনের অসীম অন্ধকার চিরে কিছুটাও আলোর সন্ধান এনে দিতে পারে তা অনেক আনন্দের।

আসলে সেইটিই কাম্য। সেই লক্ষ্যেই উদযাপনের আয়োজন। নিছক সভা সমিতি বক্তৃতা প্রভাতফেরিতে সদর্থক তেমন কিছু হবার নয়।

কিন্তু কি ভাবছে এখনকার যুবসমাজ? জীবনের অনন্য স্বর্ণালি সময়ে তাদের জীবনে বিবেকানন্দের আদর্শ কতটুকু প্রাসঙ্গিক? উত্তরটা সহজ নয়। একসময় তরুণ যুবকরা জাতীয় জীবনে যা অবদান রেখে গেছেন তা ইতিহাস। সময়ের দাবিতে মাঝেমাঝেই তাদের ক্রুদ্ধ মুঠি সমবেত হয়ে সোচ্চার হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে। তা শুধু কোন নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনা। তাদের প্রতিবাদ সংগঠিত হয় বিশ্বের অনেক দেশেরই রাজপথে, এমনকি প্রথম বিশ্বেও। সেইসব আন্দোলনে তাদের অবদান যেমন অনেক তেমনি অনেকসময় তার ফলও হয় সুদূরপ্রসারী। একটি জাগ্রত চেতনার প্রতিভূ হিসেবে তারা দায়িত্ব পালন করে যায় যথাসম্ভব। পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের নানান কর্মসূচীতে তারা অংশগ্রহণ করে সময় বের করে নিয়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবাই কি এমনি সক্রিয়? যদি নাও হয়, কতটুকুই বা দোষ দেওয়া যায় তাদের?

সবচেয়ে সংবেদনশীল আর সৃষ্টিশীল এই বয়সে তরুণ যুবকদের অনেক রকম স্বপ্ন থাকে। নিজেকে নিয়ে, পরিবারকে নিয়ে। টগবগে স্বপ্নের দিনগুলিতে পাশাপাশি থাকে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, হতাশা আর যন্ত্রণাও। বিশ্বায়নের সৌজন্যে এক সর্বব্যাপী প্রতিযোগীতা তাদের সামনে এনে দিয়েছে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। নিজের কেরিয়ার তৈরি করতে না পারলে কেউ দাঁড়াবেনা তার পিছনে-এই নিরাপত্তা-হীনতা তাকে তাড়া করে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। জটিল এই জীবনে নিজেকে ঠিকমত প্রতিষ্ঠিত করা একেবারেই সহজ নয় এখন। তাই তার জীবনের দৌড়ে কোনটিকে সে বেশি গুরুত্ব দেবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তাছাড়াও আছে আর এক ঘূর্ণি। তরুণ যুবকদের অনেক সময়েই ব্যবহার করা হয় আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজনীতির অঙ্গনে। সে এক রহস্যময় জগত। নিজের বিবেকবুদ্ধি থেকে বহুদূরের সেই জগতের কর্মকাণ্ডে কোথায় পড়ে থাকে বিবেকানন্দ, কোথায় পড়ে থাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কোথায় হারিয়ে যায় আদর্শ, মানবসেবা, শুভ অশুভের ধারণা।  অসম্ভব প্রাণশক্তির ধারক এবং বাহক এই যুবহৃদয়ের অনেকটাই ক্ষয় হয়ে যায় সঠিক পরিচর্যার অভাবে।

আসলে সঠিক কিছু পরিকল্পনা দরকার যাতে দেশের যুবকদের শামিল করা যায় আর তাদের জীবনীশক্তি, প্রাণচাঞ্চল্য আর সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগানো যায়। কিছু তরুণ যুবক স্বাভাবিকভাবেই হতে পারে বিপথগামী। পরিবার, সমাজ তথা দেশের ভালোর চিন্তা করবার তাদের সময় নেই। মূল্যবোধের চর্চা করা তাদের মতে ব্যাকডেটেডনেস। ডিজিটাল যুগের যুবক হিসেবে তাদের কাছে নিজের প্রয়োজনীয় কাজটুকু ছাড়া বাকি সব অর্থহীন। বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় বা কফিশপে সময় কাটানো ঢের আনন্দের। আবার অন্যদিকে মুক্তমনা কিছু তরুণ যুবক আন্দোলন অব্যাহত রাখে সমাজে ঘটে চলা কুপ্রথা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তারা মনে করে নিজেদের হাতখরচাটুকু বাঁচিয়ে এলাকার শীতার্ত মানুষগুলিকে কিছু বস্ত্র দেওয়া কিম্বা ক্ষুধার্ত শিশুদেরকে কিছু খাবার কিনে দেওয়া অনেক বেশি জরুরী।

সবটাই হচ্ছে বিচ্ছিন্ন ভাবে। তরুণ যুবারা তো অনেক অবহেলা এবং বঞ্চনারও শিকার। অনেক নেতিবাচক অনুষঙ্গের ঘেরাটোপে তারা বন্দি। যদি বিভিন্ন স্তরে কিছু সুসংহত বাস্তবমুখী পরিকল্পনা থাকে তবে অনেককেই তার মধ্যে এনে চিত্রটা পালটানো যায়। যুব শক্তিকে পরিণত করা যায় প্রকৃত কর্মশক্তিতে। তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চায় উৎসাহ দিয়ে, দেশ ও মানবতার কল্যাণের দিকে তাদের কাজকর্মের অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। সংকীর্ণতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামী, সামাজিক বিভেদ ও যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচার-দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেওয়া যায়। দেশের উন্নতিতে তাদের বুদ্ধি আর শ্রমকে কাজে লাগানোর জন্য কর্মসংস্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা যায়। আর সেসব যদি এমন কোনও দিবসকে ঘিরে করে ফেলা যায় তাহলে তা হবে যুবকদের পক্ষে এক অন্তহীন অর্জন।  


Facebook Comments