এযুগেও সমান প্রাসঙ্গিক কারনাডের লেখা নাটক ‘তুঘলক’

বৈশাখী দে

নাটক সমাজের দর্পণ। আপাত সাধারন ঘটনা অসাধারন হয়ে ফুটে ওঠে নাটকের আঙিনায়। আর ইতিহাস যে বারবার ফিরে ফিরে ফিরে আসে। লেখকরা যে ভবিষ্যতদ্রষ্টা তা বারবার মনে হয় গিরিশ কারনাডের নাটক তুঘলক দেখে। অদ্ভুত লাগে ১৯৬৪ সালে কারনাডের লেখা নাটকটিতে এইসমস্ত ঘটনা কী করে এল? সময় পালটায় জীবনধয়ারনের আঙ্গিক পালটায় মানুষ কিন্তু তার স্বভাব থেকে পিছু হটাতে পারে না। তাই বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে ইতিহাসের।

ভারতের ইতিহাসে ‘পাগলা রাজা’ হিসেবে পরিচিত মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে ঘটে যাওয়া ঘটনা যেন স্থান-কাল-পাত্রে পরিবর্তিত হয়ে আবার ফিরে এলো। তুঘলকের তৈরি করা মূদ্রা জাল হয়েছিল। ইতিহাস বলে প্রাসাদের মাঝে উদ্যানে নকল মুদ্রার ঢিপিতে বসে তিনি কীসব ভাবতেন আর বিড়বিড় করতেন! এক ধর্মগুরুকে সভা করার জন্য ডাকেন, ফের নিজেই আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রন করেন যাতে সভা পণ্ড হয়ে যায়। হঠাৎ মনে হওয়ায় রাজধানী স্থানান্তর করে বসলেন দিল্লি থেকে দৌলতাবাদ। এই সবেরই উল্লেখ আছে নাটকে।

নাট্যকার গিরীশ কারনাড জওহরলাল নেহেরুর প্রয়ানবর্ষে রচনা করেন এই নাটক। দেশ স্বাধীন হবার পর নেহেরুর হাত ধরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন এক শ্রেণির মানুষ, তাদের হতাশাই যেন ফুটে বেরিয়েছিল তুঘলকের কথা আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে। ইংরেজের হাতে পড়ে মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিকথার যে সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছিল, তার ভুত ঘাড় থেকে নামানোর মুখেই ‘তুঘলক’এর আগমন। সেই সময় থেকেই সারা ভারতে অনেক বড় বড় পরিচালকই নিজেদের মত ‘তুঘলক’ মঞ্চস্থ করে চলেছেন। ‘পাগলা রাজা’র ঘোর কাটিয়ে মানুষ দেখতে পাচ্ছে আগামীর স্বপ্নপথিককে।

পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ও এই শহর, এই সময়, এই দেশকে ব্যাকড্রপে রেখে উপস্থাপন করেছেন তুঘলককে, যিনি সাম্প্রদায়িক নন, যিনি সংস্কারের স্বপ্ন দেখেন। কারনাড নাটকের এক জায়গায় বিন তুগলক সম্পর্কে বলেছেন, “তাঁর ভেতরে যে স্ববিরোধিতা ছিল, দ্বিধাগ্রস্থতা ছিল, তার জন্যই মানুষ তাঁকে ভুল বুঝেছে। তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।” এ কথাটাই তো গোড়ার কথা।

সারা নাটক জুড়ে আমরা আসলে ট্র্যাজিক নায়ককে দেখতে পাই। শুরুতে অন্ধকার মঞ্চের মাঝে একটা স্পটলাইটে শুধু তুঘলকের মুখটা দেখা যায়। তাঁর দৃষ্টি আশেপাশের মানুষের দিকে নয়, অনেক দূরে। যার ভাবনা সেই সময় থেকে কয়েকশো যুগ এগিয়ে। যিনি হিন্দুদের শোষণ নয়, সবাইকে নিয়ে চলতে চাইছেন। আনতে চাইছেন নতুন রাষ্ট্রীয় নীতি। কিন্তু আইনের ফাঁক গলে সেসব সুবিধা নিয়ে চলে যাচ্ছেন কিছু সুযোগসন্ধানী! যাদের জন্য তিনি এত কিছু করতে চাইলেন তারা একইরকম রয়ে গেল। যুগে যুগে, কালে কালে এমনটাই তো হয়। শুধু প্রেক্ষাপট বদলায় মাত্র। সরকারি যোজনার সুযোগ কজন গরীব পান? সমকাল থেকে ফেলে আসা সময়, প্রতিনিয়ত অনেক প্রশ্নচিনহের মুখোমুখি দাড় করাবে এই নাটক তুঘলক।

তুঘলক চরিত্রে অসম্ভব ভালো অভিনয় করেছেন রজতাভ দত্ত। অন্যান্য অভিনেতাদের উপস্থাপনাও অপূর্ব। যেকথা বারবার বলতে হবে তা হল দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশনার কথা। অনবদ্য উপস্থাপনা। মোহিত হয়ে দেখতে হবে প্রত্যেকটি দৃশ্য। সর্বোপরি একটা কথা বলা যায় সংসৃতি নাট্যদলের দেবেশ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত তুঘলক নাটক দেখার পর মনের ভেতর সুপ্ত থাকা অনেক প্রশ্নই প্রকট হয়ে উঠবে।

Facebook Comments