‘বিবাহ অভিযান’- দু’ঘন্টার আউট এন্ড আউট এন্টারটেইনমেন্ট

   

প্রত্যূষা সরকার

রোম্যান্টিক কমেডির সংজ্ঞাটা মাথায় রেখে কোথাও গিয়ে সামান্য শেক্সপিরিয়ন আবার কোথাও পশ্চিমের মেডিয়েভল পিরিয়ড, আবার কনফ্লিক্টে রেস্টোরেশন। এ যেন টানা দু’ঘন্টা হাসির মাধ্যাকর্ষন। মোট কথা হাসতে না চাইলেও আপনাকে হাসাবে এই ছবি।
সম্প্রতি ‘বিবাহ অভিযান’ মুক্তি পেয়েছে শ্রীকান্ত মেহতার প্রযোজনায়। বিরশা দাশগুপ্তের পরিচালনা এবং রুদ্রনীল ঘোষের ঝাঁ চকচকে কমিক স্ক্রিপ্ট গোটা আবহাওয়া রমরমা করে তুলেছে। শুধু হাত-পা তুলে নাচ নয়, উচ্ছ্বাসে সিটি বাজানো নয়, জিত গাঙ্গুলীর প্রত্যেকটা গানের চমকপ্রদ ব্যবহার কমেডি জনারের বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে মেনে চলেছে। স্টোরি আউটলাইন মাঝারি, সেকেন্ড হাফে উত্তেজনা একটু দমিয়ে গেলেও হাসি বা এনার্জি কোনও ভোল্টেজকেই কমিয়ে আনা যায়নি। বাংলা কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রে এরকম আকর্ষণীয় কম্প্যাক্ট ‘হাসিবোমা’ বেশ অনেকদিন পরেই তৈরি হল।
অঙ্কুশের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, রুদ্রনীলের কথা বলার ভঙ্গিমা, নুসরত ফারিয়ার আকর্ষণীয় লুকস্, সোহিনীর চরিত্রের হাইলাইটেড ড্রামাটাইজেশন, প্রিয়াঙ্কার ছোট্ট অভিনয়ের মুগ্ধতার রেশ কাটানো যায় না সত্যিই। বিশেষভাবে উল্লেখ্য অনির্বাণ ভট্টাচার্যের আশ্চর্য মেক-ওভার এবং তার কমিক চরিত্রায়ণ। বহুবার তাঁর ট্রাজিক হিরো কিংবা কোল্ড-ব্লাডেড ভিলেনের চরিত্রে বাকরুদ্ধ হয়েছি, আজ কমেডিকে কতটা উচ্চতা অবধি নিয়ে যাওয়া যায় তিনি অভিনয় দিয়ে প্রমাণ করলেন। তাঁর উচ্চারিত শব্দের অপভ্রংশগুলোও ছিল তাজ্জব করা এবং চূড়ান্ত হাস্যকর। ছ’জন প্রধান চরিত্র ছাড়াও পার্শ চরিত্রে অম্বরীশ ভট্টাচার্যের অভিনয় প্রশংসার দাবি রাখে। 
সিনেমার বুলেট সিং অর্থাৎ অনির্বাণের অ্যাপিয়রেন্সে মেডিয়ভল রোম্যান্সের ছাপ। ল্যাঙ্গুয়েজে অপভ্রংশের ব্যবহার, বাংলা শব্দের সঠিক অর্থ বজায় রেখে ডায়লগকে আরও স্মার্ট ও কমিক করে তুলেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে মনে পড়ছে ‘বিষখ্যাত’ শব্দটি, সত্যিই বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে শব্দটা বর্তমান যুব সম্প্রদায়ের কাছে। মালতী (প্রিয়াঙ্কা) ও বুলেট সিং, ওরফে গণশার কেমিস্ট্রি বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ শেষে আধুনিকতার শুরুর রোম্যান্সের ধরণ মনে করায়। অন্যদিকে মার্কসবাদের মেটেরিয়ালিস্টিক অ্যাপ্রোচ এবং বর্তমান বাংলায় তার ব্যবহার ফুটে উঠেছে মায়ার (নুসরাত) চরিত্রে। মূর্তি পুজোর সাথে বাংলা সিরিয়ালের অনন্য কম্বিনেশন রজতের (রুদ্রনীল) জীবনকে কীভাবে ছাড়খাড় করেছে তা তার স্ত্রী মায়া (সোহিনীর) চরিত্রের মূল বিষয়। এ ছাড়াও ঘর সংসারী অনুপম (অঙ্কুশ) আধুনিকতার স্পষ্ট উদাহরণ; পুরুষ শুধু অফিস নয়, বরং রান্নাঘরও সামলাতে পারে! সাহস, ভালবাসা ও নিষ্ঠার সঙ্গেই আসে এই কাজ।
সিনেমায় বেশ কিছু নামের ব্যবহার হাসির উদ্রেক ঘটায়। বুলেট সিং-এর কর্মচারীদের নাম থেকে শুরু করে ‘হিসি দাদু’ এবং ‘তারা-পিঠ’ বিশেষভাবে বলতেই হবে।
সবশেষে বলা যায়, সামাজিক, প্রধানত স্বামী-স্ত্রীর ঘরোয়া ঝগড়াঝাঁটি এই সিনেমার মূল বিষয়বস্তু। এ যেন টম অ্যাণ্ড জেরিকেও ছাপিয়ে গেছে। বিবাহ শব্দের ভিতর যে কতগুলো ভয়ঙ্কর অক্ষর লুকিয়ে আছে তা বিশেষভাবে উঠে এসেছে ছবিজুড়ে। টলিউডের বেশিরভাগ ঘটনাই যেখানে নারী অস্তিত্ব রক্ষা কিংবা তাদের দুঃখ দুর্দশা ফুটিয়ে তুলেছে এ’ ক্ষেত্রে তার স্বল্প ব্যতিক্রম ঘটেছে। কমেডির মাধ্যমেই বেরিয়ে এল ফ্রাস্ট্রেশন শুধু মেয়েদের নয়, বরং পুরুষদেরও থাকে, অনেকটা বেশিই থাকে। সোসাইটির থেকে, সংসারের থেকে তারাও খানিক ছুটি চায়, নিজস্বতা চায় আর এখানেই চেনা ছকের হিট ফর্মুলা ‘বিবাহ অভিযান’ কোথাও গিয়ে আলাদা ভাবে নজর কেড়ে নেয়। 


Facebook Comments