একাধিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত ‘আগমনীর অবগাহন’; পালকের আড্ডায় পরিচালক অভিজিৎ রায়

   

সৌরভ মণ্ডল

এখন স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়েই। তবে খুব কম পরিচালকই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। অভিজিৎ রায় এমন একজন পরিচালক যার স্বল্পদৈর্ঘ্যের এক একটা ছবি এক একটা মাস্টারপিস। স্ক্রিপ্ট থেকে উপস্থাপনা অবধি তার ছবি কতটা দরদ দিয়ে বানানো তা দেখলেই বোঝা যায়। সম্প্রতি তার ‘আগমনীর অবগাহন’ ছবিটি একাধিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়েছে। তিনি বেস্ট ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। সেসব তো গেল স্বীকৃতির প্রসঙ্গ। ছবির মেকিং থেকে স্ক্রিনিং এই জার্নি নিয়ে পালক মিডিয়ার প্রতিনিধি কথা বলেন তার সাথে। তাতে উঠে এল অনেক অজানা কথা।

ছবিটির শ্যুটিং হয়েছে একেবারে রিয়াল লোকেশনে। ছবির গল্প এক বাবা-মেয়ের গল্প। স্বল্প পরিসরে পরিচালক দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন এক বিরাট ক্যানভাস। প্রশ্ন তুলেছেন এই বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়েও নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে। কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সামাজিক অবক্ষয়কে।  

বর্তমানের শর্টফিল্মের প্রসঙ্গে পরিচালক অভিজিৎ রায় বলেন, “বাংলা শর্টফিল্মের বেশিরভাগ কাজই ইন্ডিপেন্ডেন্ট এরিয়া থেকে হয়। তাই ফান্ডিং থেকে সবকিছু, পুরোটাই চ্যালেঞ্জিং। তবে খুব ভালো ভালো শর্টফিল্ম বাংলায় বানানো হচ্ছে। সারা বিশ্বে যা একটা আলাদা জায়গা তৈরি করছে।”

পরিচালকের কাছে জানতে চাওয়া হয় পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার পর তার অনুভূতি নিয়ে; এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রিয়াল লোকেশনে আমরা কাজ করেছি। রিয়াল লোকেশনে একটা ছোট টিম নিয়ে কোনও ছবিকে নামানো অনেকটাই কঠিন। সেগুলো করে উঠতে পারলে ভালো তো লাগেই। আর সেই ছবি স্বীকৃতি পেলে পরিচালকের তো আনন্দ পাওয়ারই কথা।”  

‘আগমনীর অবগাহন’-এর শ্যুটিং লোকেশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের কনটেন্ট-এর জন্য যে লোকেশন আর যেমন পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা ছিল তা অ্যারেঞ্জ করাটা একটু কষ্টকরই। যে গ্রামে আমরা শ্যুটিং করলাম সেটা সুন্দরবনের একদম প্রান্তিক গ্রাম, একেবারে বঙ্গোপসাগরের গায়ে। ছবিটাও তো একটা প্রান্তিক গ্রামজীবনভিত্তিক ছবি। যে গ্রামে শ্যুটিং হয় সেখানে এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে নৌকা। তবে সেখানকার মানুষরা যদি সর্বাত্মকভাবে কো-অপারেট না করতো তাহলে কাজটা করাটা সম্ভব হত না। আমাদের স্ক্রিপ্টের প্রয়োজন ছিল বৃষ্টি। দূর্গাপুজোর আগে, হালকা বৃষ্টির আবহাওয়া, সেই সময়টা ঐ অঞ্চলে পা রাখাই দুষ্কর। অনেক বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজটা করেছেন।”

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি কেন গ্রামকেন্দ্রীক ছবি বাছলেন, উত্তরে তিনি বলেন, “আমাদের ভারতবর্ষের মেজর অংশের মানুষ এখনও গ্রামে বাস করে। ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে সম্পর্কের ভেতরকার যে ভাবাবেগ গ্রামাঞ্চলে কাজ করে সেটা হয়তো শহরে আমরা অনেকাংশেই পাইনা। গ্রামের সম্পর্কগুলো এখন সহজ-স্বাভাবিক, কৃত্রিমতা থেকে খানিকটা দূরে। আর এই বাবা-মেয়ের ইকুয়েশন, সর্বোপরি নারীর অবস্থান, নারী নির্যাতনের বাস্তবচিত্র দেখাতে গ্রামটির প্রয়োজন ছিল। তবে আমি যখনই কাজ করেছি গ্রাম-শহর সবকিছু নিয়েই কাজ করেছি।”

একটু থেমে তিনি আরও বলেন, “এখনও কিন্তু অনেক গ্রামেই বিশ্বায়ন বলুন আর উন্নয়ন, কারোর ছোঁয়াই পৌঁছয়নি। ইকোনমিকাল ডেলেভেলপমেন্ট অবশ্য হয়েছে। তবে এখনও ভারতবর্ষ মেয়েদের নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। বহু কন্যাভ্রুন হত্যা হয়। যতই স্বাধীনতা, মুক্তি এসবের প্রসঙ্গ আসুকনা কেন একটা বড় অংশের মেয়েদের নির্যাতিত হতে হয় এখনও। আর সেগুলো তো আমাদের চোখের সামনে আসে। নাড়া দেয়। তাই এই সোসাইটিতে আমরা নির্দেশকরা যদি সামাজিক সমস্যাগুলোকেই সামনে তুলে না আনতে পারি তাহলে সিনেমা করার মানে কী? সমাজের কথা তো সিনেমায় প্রতিফলিত হবেই।”

নিজের কাজ প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, “আমি আমার ছবিতে দুটো জিনিস খুব বেশি করে প্রাধান্য দিই। এক নবাগতদের আর দুই মিউজিককে। আমাদের ‘আগমনীর অবগাহন’-এর মিউজিকও কিন্তু একজন নবাগতারই করা। হিয়ার এই মিউজিক কিন্তু যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে ফিল্ম ফেস্টিফ্যালগুলোতে। এই ছবিতে আমরা তিনটি গান ব্যবহার করেছি, তার মধ্যে একটি দু’শো বছরের পুরনো একটি প্রচলিত টপ্পা, এছাড়া দুটো ফোক আঙ্গিকের মিউজিক। শর্টফিল্মে গান নিয়ে আগামীতেও অনেক এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করবার ইচ্ছে আছে। কারণ শর্টফিল্মে কিন্তু গানের প্রয়োগ একটা অন্য মাত্রা আনে।”

Facebook Comments