মিজান হাওলাদার-এর গল্প

একটি বুনো গাছের আত্ম-কথা


আমি অবহেলা অনাদরে দাঁড়িয়ে আছি। বছর যুগ যুগান্তর ।প্রতিকূল সময়ের সাথে যুদ্ধ করে তবুও বেঁচে থাকা। কত লতাগুল্ম আমায় আকড়ে ধরে আছে। আমি যেমন জীবনের জন্য শিকড় মেলে মাটি আকড়ে ধরে বেঁচে আছি।তেমনি কত নতুন পাতাযুক্ত লতাপল্লবের অগ্রভাব ঠিক আমাকে জীবনের একমাত্র অবলম্বন ভেবে বেড়ে ওঠেছে।তাদের চাপ-দণ্ডে আমি চিৎকার করে কেঁদেছি! তবুও যতদিন গেছে, ওরা বেঁচে থাকার জন্য আমায় শক্ত করে আকড়ে ধরেছে।আমি নিরুপায় হয়ে! শুধু আত্ম চিৎকার করেছি।
সর্বশেষ গত বৈশাখী ঝড় আমার শাখা প্রশাখা ক্ষত বিক্ষত করে দিলো।
হায়রে ভাগ্য! যা ছিল আমার অস্থিত্বে, তা থেকেও ছাতরা পোকা ছাল বাকল চুষে-চুষে রস খেয়ে নিলো।
আহারে! চৈত্রের খড়ায় পোড়া রৌদ্রে পুড়ে বারবার চৌচির হয়েছি। পানি পানি বলে আমি চিৎকার করে কেঁদেছি! কে শুনবে আমার কথা? কেউ শুনে নি।আমি যে অপ্রয়োজনীয় বুনোগাছ!

আমি জীবনভর অবহেলা অনাদর সহ্য করে মানুষ, পশুপাখি, লতাপল্লবকে কত কিছই না দিয়ে গেলাম। আজও দিচ্ছি।
অথচ আমার থেকে ঠিক বিশ গজ দূরে যে জলপাই গাছ। ওটা কত মানুষের যত্নে বেড়ে উঠেছে!সময় মতো সার ঔষধ দিয়েছে, প্রয়োজন মতো পানি। লতাপাতা পরিষ্কার পরিছন্ন করে, সন্তানের মতো লালন পালন করে বড় করেছে। তা দেখে আমি শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি।
আমার লোভ হতো, মনগত ইচ্ছে জাগতো _
আমি যদি জলপাই গাছ হতে পারতাম। তাহলে স্বার্থান্ধ মানুষরা আমাকেও ফলের আশায় যত্ন নিতো। আমিও মানুষের আদর যত্ন পেয়ে তড়বড় করে বেড়ে উঠতাম। কিন্তু না-আমি যে বুনোগাছ। আমাকে মানুষের কোন প্রয়োজন নেই। এতটুকু কথা ভেবে ভেবে নিজেকে এতটা বছর সান্ত্বনা দিয়েছি। আমাকে দিয়ে তাদের বা কি হবে?তাই তো আমার দিকে কেউ ফিরে তাকায়নি।

আমার পূর্ব পাশে যে বিস্তৃত বিশাল ফলসের মাঠ। ওখানে ফসল ফলানোর মৌসুমে কৃষকগোষ্ঠীরা কাজ করে। তাঁরা পরিশ্রম করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে যেতো তখন আমার তলদেশে বিশ্রাম নিতো। কিংবা ভরদুপুরের অসহ্য সূর্যের আলো উত্তাপ যখন সহ্য করতে পারতো না। তখন ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ছুটে আসতো আমারই পাদদেশে।আমার ছায়ায় বসে তাদের সর্বাঙ্গ শীতল করতো। কৃষাণী জল খাবার নিয়ে আসতো। আমার ছড়ানো ছিটানো শিকড়ে আরাম করে বসে কৃষক খেতো।আমি তাদের ভালোবাসা উপভোগ করতাম। হাসি আনন্দ তামাশা দেখতাম তাদের কি সুন্দর বন্ধন।
তাছাড়াও কত কিশোর কিশোরীর দূরান্তপনার সাক্ষী আমি।
গত কয়েকদিন আগে এক কৃষকের ফসলের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা আমার সরু ডালটি কেটে দিলো। আমার এই ডাল ওদের ফসলে ছায়া দেয়।তাতে ফসলের ক্ষতি হয়।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এই কৃষকই একদিন ক্লান্তি দূর করার জন্য, আমার পাদদেশে বসে শীতল হতো। ঘন্টার পর ঘন্টা আমার শিকড়ে বসে থাকতো। কৃষকের স্বার্থে এখন আঘাত লেগেছে। এখন আমাকে তার প্রয়োজন নেই ডাল কেটে দিলো।একবার ও ভাবলো না, আমার সহ্যাতীত নিদারুণ কষ্টের কথা। আমি ছোট থেকে এমনই প্রয়োজনে সবার ছিলাম।প্রয়োজন শেষে আমি কারও ছিলাম না, এখনও প্রয়োজন ব্যতীত কারও না।

আরও কয়েক বছর আগের কথা।আমার একটি ডালে দোলনা তৈরি করে ঐ মৃধা বাড়ীর নাত নাতীরা প্রতিদিন খেলতো। আরাম করে ঝুলতো। দোলনাটি সে বাড়ীর বড়ো কর্তা মোশারফ মৃধা তৈরি করে দিয়ে ছিল। তারপর,
একদিন তার এক নাতী দোলনা ছিড়ে পড়ে হাত ভেঙে যায়। এই দোলনায় ওরা ঝুলতো আর আমার ছাল বাকল ছিড়ে ছিড়ে মাটিতে পরতো। আমি যন্ত্রনায় চিৎকার করতাম। কেউ শোনার ছিল না। মৃধা বাড়ীর নাতীর হাত ভাঙায় _তাতে আমার কী দোষ!
আমার ডাল দোলনা ঝুলানোর উপযোগী না হলে। কেউ দোলনা টানাতে পারতো না।
মোশারফ মৃধা রাগ করে আমার ডালটাই কেটে দিলো। যাতে করে আর কেউ দোলনা টানিয়ে ঝুলতে গিয়ে হাত পা না ভাঙে। এমন অকৃতজ্ঞ মানুষের শত শত কষ্টের কথা বুকে চেপে এখনো বেঁচে আছি। এসব কষ্টের কথা কার কাছে বলবো। বলেই বা কি হবে, কোন মানুষ তো আমার কথা শুনবে না। আমার কষ্ট বুঝবে না।শুধু আমার ব্যথাভরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কোন উপায় নেই। শুধু এতটুকু বলি _হায়রে মানুষ তোমরা এত নিষ্ঠুর কেন?

সম্প্রতি খুব জানতে ইচ্ছে হয় এখানে কিভাবে এলাম? এখানে জন্মেছি বলেই আমি এত নির্মমতার স্বীকার?
আমার কী দোষ? কে আমাকে রোপণ করেছে?
তবে মাঝে মাঝে পাখপাখালি আমার শাখা প্রশাখায় বসে বসে-গল্প করে। আমি নাকি এক পাখির মায়ের মুখ থেকে পতিত ফলের বীজ থেকেই এখানে জন্মেছি। এটা শুনে খুব খারাপ লাগে। কেননা, আর কোথাও আমার বীজ পড়ার জায়গা পেল না। যদি এখানে না জন্মে, গভীর অরণ্যে জন্ম নিতাম। তাহলে অন্তত এই স্বার্থপর মানুষ গুলোর ভোগের স্বীকার থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতাম।
এখন মৃধা বাড়ীর অনেকেই দাবী করে আমাকে রোপণ করেছে। অথচ আজও আমি সত্যি কথা জানি না! কিভাবে কোথা থেকে এলাম কৌতুহল থেকেই গেলো মনে।

আগে আমি কারও ছিলাম না। এখন আমি মৃধা বাড়ীর চার ছেলের। হাসি পাই শুনে!
আমি ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে আছি।
-এই জমির অংশীদার চারজন।মৃধা বাড়ীর বড় কর্তা মোশারফ মৃধা মারা যাওয়ার পর পরই এই জমি ভাগাভাগি শুরু হয়েছে। মজার বিষয় এখন আমার অংশের জমিটুকু মৃধার চার ছেলে সবাই চায়। কারন আমি এখন অনেক মোটা তাজা একটি গাছ।আর ঐ আদরের জলপাই গাছের জমির অংশ কেউ নিতে চায় না। কারন, জলপাই গাছ এখন বয়োবৃদ্ধ হওয়ায় তেমন ফল হয় না। জলপাই গাছ কেটে ফেললে এখন তেমন প্রয়োজনে আসবে না। শুধু লাকড়ি হিসাবে ব্যবহার করা যাবে।

আর আমি বুনোগাছ অবহেলা অনাদরে থেকেও। বারবার মানুষের প্রয়োজন শেষে বলি হয়েও -মোটা তাজা আমার শরীর। এখন সবার একটাই দাবী _ আমার স্থানের জমির অংশটুকু চাই।
আবার কেউ কেউ নকশা আঁকে। এই গাছ ভাগে পেলে ঘরে খুঁটি বানাবে।কেউ বিক্রি করে আর্থিক প্রয়োজন মিটাবে।শুধু সবারই প্রয়োজনের চিন্তা। কেউ বলে না।
এই গাছ এখানেই থাকবে _যে ভাবে জন্মেছে -সেভাবেই মৃত্যু অবধি এখানেই থাকবে। কেউ আমরা কাটবো না।
তা না ভেবে আজ তাঁরা নিজ নিজ স্বার্থের কথা ভাবছে।অথচ, একদিন আমার পরিচর্যা তাঁরা কেউ করেনি।আমার ডালপালা একটু ছড়িয়ে গেলে_সকালে একজন আবার বিকালে একজন এমন ভাবে কেটেছে। একবারও ভাবেনি _আমার কষ্টের কথা!তবুও আজ আমাকে সবাই নিজের করে চায়।এটা কম আনন্দে নয়।কিন্তু কত আদর যত্নে বেড়ে ওঠা জলপাই গাছ এখন কেউ চায় না।
আজ আমি গর্বিত। আমি অহংকার করে বলতে পারি।অবহেলা অনাদরের থেকেও মানুষের হতে পেরছি।এতো মানুষ আমাকে নিজের করে নিতে চাচ্ছে। তা শুনে আজ আমার কোন দুঃখ নেই। শুধু এই ভেবে আমার মৃত্যুর পরেও আমি স্বার্থান্ধ মানুষের কতটা প্রয়োজনীয়।

Facebook Comments