ভালোবাসার সেতু পেরিয়ে মোৎজার্টের শহরে

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

ভালোবাসা কে কতভাবে যে দেখা যায়! তা যদিও মূলত এক বন্ধনের বোধ, প্রিয়জনের সঙ্গে মনে মনে জড়িয়ে থাকার এক অনুভব। তবু মনের ভিতরের সেই গভীর বন্ধনকে শুধু উপলব্ধি করেই বোধ হয় তৃপ্তি হয়না। তার কিছু প্রকাশও দেখানো চাই। তার জন্য সাহায্য নেওয়া হয় কোন প্রতীকের।

সেই কথায় আসার আগে জায়গাটির কথা একটু বলে নিই। ২০১৬ তে আমি আর আমার স্ত্রী জার্মানিতে গিয়ে ছিলাম কয়েকমাস। ছেলে তখন ওখানে পোস্ট গ্রাজুয়েট রিসার্ছ করছিল। জায়গাটা জার্মানির বেভারিয়া প্রদেশের সুন্দর এক শহর গার্মিশ-পার্টেনকার্চেন, সংক্ষেপে গার্মিশ। মিউনিখ থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে, আল্পসের কোলে ভীষণ সুন্দর সাজানো গোছানো শহর। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। ওই শহরটার পাশেই বর্ডার পেরলে অস্ট্রিয়া দেশটি। 

গার্মিশ থেকে একদিন সকালে আমরা গেলাম অস্ট্রিয়ার এক সুন্দর শহর সলস্‌বুর্গ (Salzburg)। সেই জায়গাটার কথাই আসলে বলতে চেয়েছি। সলস্‌বুর্গ হল মহান সঙ্গীত প্রতিভা মোৎজার্ট(Wolfgang Amadeus Mozart)এর জন্মস্থান। শহরটি অস্ট্রিয়ার সলস্‌বুর্গ নামে একটি রাজ্যেরই রাজধানী। সলস্‌বুর্গ নামের অর্থ নুনের দুর্গ(Salt Castle)। অষ্টম শতাব্দীতে এই অঞ্চলে লবণের ব্যাবসা ছিল অন্যতম প্রধান ব্যাবসা। নিকটেই কয়েকটি লবণের খনি দেখার ব্যবস্থাও আছে। শহরের মধ্যেকার স্যালজাক নদী দিয়ে বয়ে চলত লবণ পরিবহণকারী অনেক নৌকা। সেগুলি থেকে টোল ট্যাক্স আদায় করা হত এই দুর্গ গুলির মাধ্যমে।

তখন ২০১৬ তে সলস্‌বুর্গ এ দ্বিশত বর্ষপুর্তি উৎসব পালিত হচ্ছে। আগে রাজ্যটি ছিল জার্মানির বেভারিয়া রাজাদেরই অধীনে। শাসনকার্য পরিচালিত হত গির্জা থেকে। ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলনের পর মিউনিখ চুক্তি অনুসারে ১লা মে সলস্‌বুর্গ পাকাপাকি ভাবে চলে আসে অস্ট্রিয়ার অধীনে। সেই উপলক্ষ্যে নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল সারা শহর জুড়ে।

আল্পস পর্বতমালার উত্তরে নদী আর পাহাড় ঘেরা অসাধারণ সুন্দর শহর এই সলস্‌বুর্গ। প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের ও গ্যোথিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় সর্বত্র। দুপাশে উঁচু সুদৃশ্য বাড়িঘর, মাঝখানে সরু রাস্তা, দুধারেই নানান রকম দোকান পাট, অজস্র পর্যটক। শহরটি শিল্প সংস্কৃতি আর মোৎজার্ট এর শহর বলেই প্রসিদ্ধ। সেই হিসাবে বলা চলে সঙ্গীতের তীর্থক্ষেত্র। আমরা প্রথমেই দেখলাম মোৎজার্ট এর বাড়িটি  (Mozarts Geburtshaus) এই বাড়িতেই তিনি জন্মেছিলেন ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ২৭ শে জানুয়ারি। এই বাড়িটিই এখন অন্যতম মোৎজার্ট মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে। ভাবতে রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম। পৃথিবী বিখ্যাত সেই মানুষটির সৃষ্ট সুর শুনেছি, ছবিতে দেখেছি, কিন্তু যেখানে তাঁর জন্ম, সেখানে, তাঁরই বাড়িতে আসতে পেরেছি, সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। আসলে পুরো শহরটিই মোৎজার্টময়।  টি শার্ট, কেক, চকলে্‌ট, সেন্ট ইত্যাদির প্যাকেট, বিভিন্ন উপহার সামগ্রী এবং প্রায় সব জিনিষেই রয়েছে মোৎজার্ট এর ছবি। শহরটির আর একটি খ্যাতি রয়েছে এই কারণে যে বিখ্যাত ছবি ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ এর লোকেশন শ্যুটিং হয়েছিল এইখানেই। মিরাবেল গার্ডেন ছিল অন্যতম শ্যুটিং স্পট। জানলাম প্রতি বছর তিন লক্ষ মানুষ আসে শুধু ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ এর  শ্যুটিং লোকেশন গুলি দেখতে।

সলস্‌বুর্গ এর একটি বড় আকর্ষণ হল Hohensalzburg Castle  নামে ৯০০ বছরের পুরনো একটি বিখ্যাত দুর্গ। একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপর দুর্গটির অবস্থান (৫০৬ মিটার উপরে)। এক সময় এটি ব্যারাক এবং জেলখানা হিসেবেও ব্যবহৃত হত যদিও আসলে রাজার নিরাপত্তার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছিল। মধ্যযুগের ইউরোপের বৃহত্তম এই দুর্গটি দেখার অভিজ্ঞতা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

শহরের মাঝখানে সিটি সেন্টারে এক স্থানে অনেকটা জায়গা নিয়ে চলছে দাবা খেলা। বড় বড় দাবার ছক কাটা আছে সেখানে, আর দাবার গুটিও সেই অনুপাতে বড়। পাশে বেঞ্চিতে বসেও দাবা খেলছে দুই প্রতিযোগী, ঠিক কলকাতায় গড়িয়াহাটের মোড়ে যেমন খেলা চলে। শহরটার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলছে একটি সরু নদী। নাম স্যালজাক। ঠাণ্ডা জলের স্রোত নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলেছে। নদীর উপর মাঝে মাঝেই সেতু রয়েছে এপার ওপার করার জন্য। এরকম একটি সুন্দর সেতু পেরনোর সময় অবাক হতে হ’ল। এই সেতুতেই দেখলাম প্রথমেই বলা ভালোবাসার সেই প্রতীকি নমুনা।

সেতুটির দুধারে রেলিংয়ে নানান রঙের অজস্র তালা ঝুলছে। জানলাম সেতুটিকে সবাই চেনে লাভলক ব্রিজ(Lovelock bridge) নামে। ব্রিজটির দুপাশের রেলিংয়ে তারের জাল লাগানো। সেই জালে ঝুলছে নানান রঙের অজস্র তালা। ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের। দামী প্যাডলক তালা যেমন আছে, তেমনি আছে সাধারন তালাও।

সেগুলি ভালবাসার, বন্ধনের প্রতীক। ভালোবাসার নামে তালা লাগিয়ে চাবিটি নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়। এর পিছনে কাজ করে একটা বিশ্বাস যে ভালোবাসা চিরন্তন, এ তালা আর কোনও দিন খোলা যাবেনা কারণ চাবি হারিয়ে ফেলা হয়েছে নদীর জলে। বলা বাহুল্য সে ভালোবাসা শুধু প্রেমিক প্রেমিকার নয়। যে কোন একজনের প্রতি আর এক জনের ভালোবাসা হতে পারে। ভাই বোন, সন্তান, মা বাবা, বন্ধু যে কেউ। আসলে ভালোবাসার বন্ধনকে চির অটুট রেখে দেওয়ার এ এক অদ্ভুত পন্থা। পরে বুঝতে পারলাম প্রায় সব দোকানেই কেন এত রঙ বেরঙের নানান সাইজের তালা চাবি বিক্রি হচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছিল আমাদের এখানেও অনেক জায়গাতেই অনেক কিছু কামনা করে সূতো বা ঢিল বাঁধা হয়। হয়তো তার পিছনে মানুষের কিছু কামনা বাসনা থাকে, কিন্তু উপলব্ধি করলাম যে দেশ কাল নির্বিশেষে সংস্কার এবং মনের আর্তি টা প্রায় একই।

Facebook Comments