স্বপ্নপুরী সাতকোশিয়া

স্বপ্নময় গায়েন

বছরখানেক আগে মুন্নাদার প্রোফাইল থেকে সাতকোশিয়া নামক জায়গার কথা জানতে পারি। মুন্নাদার তোলা ছবি দেখে এবং লেখা পড়ে সাতকোশিয়া যাওয়ার জন্য ভীষণ উদগ্রীব হয়েছিলাম। টানা একবছর ধরে সব বন্ধুদের মুন্নাদার তোলা ছবি দেখিয়েছি তখন সবাই জায়গাটার খুব প্রশংসা করে, কিন্তু সঠিক ভাবে কেউ বলে না, কবে যাবে। অতএব ইচ্ছা থাকলেও একা যাওয়ার মতো সাহস না হওয়ায় মনের ইচ্ছে দমন করে রাখতে হয়।

কলকাতার পুজো আমার কোনদিন ভালো লাগে না। পুজোর সময় প্রতিবার গ্রামের বাড়িতেই চলে যাই। এবছর আগে থেকেই ঠিক হয়, দূর্গা পুজোয় বড়নতি ও কালীপুজোর সময় সাতকোশিয়া ঘুরতে যাওয়া হবে। বন্ধুরা ঘুরতে যাওয়ার কথা বললে যা চিরকাল হয়, তাই আমাদের হল, দূর্গা পুজোয় যাওয়ার কথা ছিল ৮জন কিন্তু ঘুরে এলাম ৫জন, আচ্ছা সে কথা এখন থাক।

কালীপুজোয় আমি ও আমার বন্ধু মিলে সাতকোশিয়া যাব বলে ঠিক করি। সেই মতো একটা ইনফরমেশন জানতে ফেসবুকে ভ্রমণ মূলক একটা পেইজে পোস্ট করি। তারপর হঠাৎ করে আমার ফেসবুকে মুন্নাদার কাছ থেকে একটা মেসেজ আসে “নভেম্বর ৩, আমি আর একজন যাব, তুমি কি যাবে? আমরা এক চায়ের দোকানে রাত কাটাবো, এইভাবে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে বলবে।” আমি সাথে সাথে যাওয়ার জন্য রাজী হয়ে যাই। রাজী ‌না হয়ে কি পারি? যার প্রোফাইল থেকে সাতকোশিয়া সম্পর্কে জানতে পারলাম, যার নিয়মিত ঘুরতে যাওয়ার ছবি ও লেখা নিয়ে বাড়িতে মা-বাবা-দিদির-আমার চর্চা হয়। তাই সেই মানুষটির সাথেই সাতকোশিয়া ঘুরতে যাব, ব্যাপারটা যেন একটা স্বপ্নের ঘোরের মতো লাগতে লাগলো।

ঠিক যাওয়ার ২দিন আগে বন্ধুটা জানালো, অফিস থেকে সে ছুটি পাচ্ছে না, শুনে আমি তো ‘থ’ হয়ে গেলাম। একবছর ধরে দেখা একটা স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মুখে, মনে মনে ঠিক করে নিলাম একাই যাব। মুন্নাদার সাথে সাতকোশিয়া ঘোরার এই সুযোগ কিছুতেই মিস করা যাবে না। যাওয়ার দিন সকালে মাসির ছেলে ও বন্ধু আজাহারকে যাওয়ার জন্য একটিবার বললাম। তখন তাদের কী যে হল মুন্নাদার একবছর আগের পোস্টটা দেখেই হঠাৎ রাজী হয়ে যায়। অগত্যা আমার সঙ্গী দু’জন। ঠিক আগেরদিন জানলাম, মুন্নাদা ট্রেনে যাচ্ছে, তার সাথে আরও একজন নাকি যাচ্ছে।

মুন্নাদার কাছ থেকে জানা ছিল বাবুঘাট থেকে বাস যায় ওখানে। তাই সেদিন তড়িঘড়ি বাবুঘাট পৌঁছাই সন্ধ্যে ৬ টায়। খুঁজে বের করি আঙ্গুল যাওয়ার বাস, রাত ৯টায় বাস ছাড়ল। আঙ্গুল পৌঁছাল ঠিক সকাল ৭.৩০ নাগাদ। সেখানে গিয়ে জানতে পারি টিকরপাড়া যাওয়ার আগের বাস ৭টায় বেরিয়ে গেছে, পরের বাস ৯ টায়। অগত্যা আমরা ফ্রেস হয়ে বাসে বসলাম। ৯টায় আমাদের বাস ছাড়লো।বাসটার অবস্থা যা, বসে বসে অযান্ত্রিক গল্পের গাড়িটার কথা খুব মনে পড়ছিল।

প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর বাস জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করল। রাস্তায় কোন গাড়ি দেখতে পেলাম না। আমাদের বাস পাহাড়ী চড়াই উতরাই পথ বেয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। মাঝে মাঝে পথের পাশে বোর্ডে লেখা দেখতে পেলাম হাতি যাতায়াতের পথ। বুঝতেই পারলাম, আমারা সাতকোশিয়া টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। এরপর পড়ল পাম্পসার চেক পোস্ট। বাইরে থেকে লোক এলে ফরেস্টের মধ্যে ঢুকতে গেলে এখান থেকেই পারমিশন নিয়ে ঢুকতে হয়। আমারা যেহেতু পাবলিক বাসে গেছিলাম, তাই আমাদের পারমিট আর দরকার হয়নি। ১২.৩০ নাগাদ আমাদের বাস টিকরপাড়া পৌঁছায়। টিকরপাড়া ছোট্ট একটা গ্রাম। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা। বাস স্ট্যান্ডে তিন চারটে ঝুপড়ি দোকান। চারিদিকে পাহাড়ের মাঝে অল্প একটু সমতল জায়গা, স্থানীয়রা সেখানে চাষ করে। চারদিক দেখতে দেখতে, দূরে মুন্নাদাকে চোখে পড়ল। তখন আমারা ৩ জন, ছুটতে ছুটতে মুন্নাদার সম্মুখে উপস্থিত। তিনি আমাদের তখন ভরসা, কোথায় থকব, কী খাব কিছুই জানি না। মুন্নাদা সেই চায়ের দোকানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন, আমরা ৩ আর ওরা ২ জন। এরপর চলল আমাদের পায়ে পায়ে সাতকোশিয়াকে দেখা।

এই দু’দিন আমাদের আশ্রয় মুন্নাদার পূর্ব পরিচিত সেই চায়ের দোকান। আমরা দোকান বলতে যা বুঝি, সেই অর্থে মাসির এই দোকানে তেমন কিছুই নেই, যে দুটি বাস টিকরপাড়া প্রতিদিন আসে, তার ড্রাইভার আর হেল্পার এখানে ভাত খায়। সকাল-সন্ধ্যায় স্থানীয় কিছু মানুষ চা, চপের জন্য ভীড় জমায়, এই আর কী।



মুন্নাদার সাথে যে দাদাটি ছিল, তার নাম অনুপম। অনুপমদা আমাদের ৩ জনের থেকে বয়সে বড় হলেও, সহজেই ভাব হয়ে যায় বেশি করে।
এরপর মুন্না দার নির্দেশ মতো আমরা স্নান করতে যাওয়ার জন্য সবাই চট জলদি প্রস্তুত হয়ে নিলাম। এদিকে আমাদের ৩ জনের আগের দিন রাত ৯টার সময় খাওয়া, অতএব আমাদের কী অবস্থা, কল্পনা করাই যায়। আমাদের সবার মত অনুযায়ী মুন্নাদা মাসীকে বলে গেল, আমরা স্নান করে এসে খাব।

মাসির দোকান থেকে নদী ৫/৬ মিনিট হবে কিন্তু ওখানে যে নদী আছে, কেউ বুঝতেই পারবে না। মাসির দোকানের পিছনেই খাড়া একটা পাহাড়, সামনে অল্প কিছুটা প্রশস্ত মাঠ, মাঠের মাঝে বরাবর একটা রাস্তা নদীতে চলে গেছে। রাস্তার দুপাশে সারি দিয়ে খেজুর গাছ, দেখলে মনে হবে গাছগুলো কেউ বসিয়ে দিয়েছে। সেই রাস্তা ধরে আমারা ৫ জন এগোলাম নদীর দিকে স্নানের উদ্দেশ্যে। একটু হেঁটেই নদীর পাড়ে চলে এলাম।
এখানে এসে, আমাদের ৩ জনের মুখে কোন কথা নেই, শুধুই মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকা। মাঝখানে নীল জলের নদী, ওপারে লাল বালির চড়া। আর নদীর দুপারে মেঘ জড়ানো সারি সারি সবুজ পাহাড়। নদীতে নেমে চললো স্নানের পর্ব, অবশ্য মুন্নাদা বারবার সতর্ক করছিলেন, নদীতে কুমীর আছে, নদীর বেশি ভিতরে না যেতে। কথাটা তখন কেউ খুব বেশি গুরুত্ব দিইনি। সারারাতের বাস জার্নি যেন লাঘব হয়ে গেল স্নান করে।
দুপুরের খাবার খেয়ে, অসমাপ্ত নির্মিয়মান মন্দিরের দোতলায় বিশ্রাম নিলাম একঘন্টা মতো। বিকালে আমি, আজাহার, ভোলা ঘুরতে বের হলাম, মুন্নাদার কথা শুনে ঘড়িয়াল প্রকল্প দেখতে।
হ্যাঁ, সাতকোশিয়া শুধুমাত্র টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টের জন্য নয়, ঘড়িয়াল প্রকল্পের জন্যও বিখ্যাত। সুচিত্রা ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব গুহ এই সাতকোশিয়া, টিকরপাড়া সম্বন্ধে লিখে গেছেন অনেক আগেই।

ঘড়িয়াল প্রকল্প দেখে আমরা ফিরলাম আবার নদীর পাড়ে। এখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। এখানে সন্ধে খুব তাড়াতাড়ি নামে। স্নান করতে এসে নদীর যে রূপ দেখেছিলাম, বিকাল বেলায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। দিনের শেষ আলো নদীর জলে পড়ে ঝলমল করতে লাগলো। সন্ধ্যার মুখোমুখি একে একে অনেক জেলে নৌকা এই জায়গায় আসতে লাগলো। সকালে এরা বেরিয়ে পড়ে, সারাদিন মাছ ধরার পর সন্ধ্যায় আবার ফেরে।
আমরা যেখানে স্নান করতে নেমেছিলাম, সেইখানে ফেরিঘাট। দুপুরে মুন্নাদা মাঝিকে জিজ্ঞেস করে রেখেছে, কাল ভোর ৫টার দিকে পার হওয়া যাবে কিনা।
সন্ধ্যা হতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাঘের ভয় তো আছে, আমরা তাই বেশি দেরী না করে চলে আসি দোকানে। আমাদের আগেই মুন্নাদা ও অনুপমদা ঘুরে চলে এসেছে। সন্ধ্যাবেলা চা, মুড়ি চপ দিয়ে টিফিন সারা হলো। তারপর অন্ধকারে ৫জন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি হাঁটতে। কিছুটা গিয়ে একটা জায়গায় বসি। মুন্নাদা সেইখানে তখন সন্ধ্যার নামাজ সেরে নেন। আমারা সাতকোশিয়াতে যখন গেছি, তখন অমাবস্যা। বহুদিন পর রাতের আকাশে এমন উজ্জ্বল তারা দেখলাম। এখানে বসেই মুন্নাদা আর স্থানীয় একজনের কথোপকথন থেকে জানি, রাত ১১/১২ টার দিকে পাহাড় থেকে প্রচুর হরিণ এই মাঠে নামে ঘাস খেতে। মুন্নাদা বাদে আমারা তো উত্তেজিত, রাতে হরিণ দেখব।

এখানে সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মাসিকে তাই কষ্ট না দিয়ে ৮টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম সবাই। বাইরে আর এক দফা হেঁটে এসে শোয়ার তোড়জোড় শুরু।
সেদিনের মতো বাঘের ভয়ে রাতে আর হরিণ দেখতে বের হওয়া হল না। আমি খাটিয়ায়, মুন্নাদা বেঞ্চে, আজাহার অনুপমদা ও ভোলা মাটিতে বস্তা পেতে শুয়ে পড়লাম। রাতে মোটামুটি ২বার একাই বাইরে বের হয়েছি। সামান্য একটু ঘুম লেগেছে চোখে, বাঁশের বেড়ার বাইরে তখন একটা কুকুর বিকট শব্দে ডাকতে শুরু করে, রাত তখন ২/৩ টে হবে। বোঝাই যায় এ ডাক স্বাভাবিক নয়। সেই চিৎকারে সবার ঘুম ভেঙে যায় তখন। অনুপমদা ইয়ারকি করে বলে, বাঘ এসেছে বোধহয়।

সেদিন ভোর ৪.৩০ এর দিকে সবাই উঠে রেডি হয়ে ৫টার সময় বেরিয়ে পড়ি। নদীর পাড়ে সকালবেলার সে দৃশ্য কখনই ভোলবার নয়। জান্নাত, স্বর্গপুরী বললেও কম হবে। ঈশ্বর সাতকোশিয়াকে দু’হাতে ঢেলে সাজিয়েছেন। তারপর নৌকা করে ওপারে পার হয়ে বালুচর পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকি। স্থানীয় মানুষের চলার একটা পথ ধরে ৫ জনে হাঁটতে শুরু করি। আমরা তখন জঙ্গলের কোর এরিয়া দিয়ে চলেছি, ব্যাপারটা আমি সিরিয়াসলি নিইনি তখনও। প্রায় ৫,৬ কিমি হাঁটার পর, ফরেস্ট গার্ডের নিষেধাজ্ঞায় ফিরতে হল। আসার পথে, আজাহার আর অনুপমদা হরিণ দেখতে পেল। আমরা শুধু বানর আর বন মুরগী দেখে সন্তুষ্ট থাকলাম। নৌকা পার হয়ে যেদিক গেছিলাম, এবার তার উল্টো দিকে হাঁটা লাগালাম, স্থানীয় একজনের থেকে শুনি ১কিমি এদিকে গেলে একটা গ্রাম পাব। প্রায় ৩কিমি হাঁটার পর গ্রামটি পেলাম। পাহাড়ের মাঝে একটু সমতল জায়গায় ১০,১২ ঘর মানুষের বাস। পাশেই পাহাড়ী জলধারা।

এবার ফেরার পালা। আসতে আসতে নদীর পাড়ে দেখি বিশাল এক কুমীর রোদ পোয়াচ্ছে। দেখেই তো আমাদের চোখ ছানাবড়া। নৌকা পার হয়ে এপারে আসতে প্রায় ১২টা বাজল। এবার নদীতে স্নান করতে যেতে সবারই গা ছমছম করতে লাগলো। একটু আগেই কুমীর দেখে এলাম, তবুও স্নানটা সেখানেই করলাম।

আজই আমাদের ফেরার দিন। দেড়টায় আঙ্গুল যাওয়ার বাস ধরলাম সবাই।
বাসে স্থানীয় একজন জোরে জোরে মোবাইল ফোনে খবর চালালো। শুনলাম গতকাল টিকরপাড়ায় বাঘের হানা। আমারা ৫জন এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মুখ দিয়ে কথা আর বেরচ্ছে না। রাতে কুকুরের জোরে জোরে ডাক, অনুপমদার ঠাট্টা, রাতে আমার একলা বাইরে যাওয়া, সবকিছু যেন মাথায় পাক খেতে লাগল সারাক্ষণ।

প্রেমিকা সাতকোশিয়া, আবার ফিরতে চাই মুন্নাদার “এএএএ… গায়েন” ডাকটা সাথে নিয়ে কারেন্টহীন, মোবাইলে টাওয়ারবিহীন, পর্যটকহীন, চায়ের দোকানী মাসির কাছে, সরল মানুষগুলোর কাছে। রোমান্সে ভরা, পায়ে হাঁটা আমার স্বপ্নপুরী সাতকোশিয়া, আবার ফিরে আসব একদিন।

Facebook Comments