লাচুং থেকে জিরো পয়েন্ট, সিকিম

জয়তী অধিকারী

দার্জিলিং মেল, শিয়ালদা থেকে রাত ১০:০৫ মিনিটে। আবার আমার মনের মত জায়গায় যাবার উচ্ছ্বাসে টিকেট বা পি.এন.আর. চেক না করেই উঠে পড়লাম S3 কোচে। উঠেই স্লিপিং ব্যাগ আর চাদর বের করে বার্থের নীচে স্যাক ঢোকাতে যাব, কানে এলো কে যেন বলছেন, “মেরা একতালিশ অউর চওয়ালিশ হ্যায়”। একি উৎপাত! 44 তো আমার, এই কোচেই। কোচ নং দেখেই তো উঠেছি। কিন্তু ভদ্রমহিলা আবার জোর দিয়ে বলায় আমার কনফিডেন্স লেভেল ওভার থেকে নেভার হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি টিকেট বের করে দেখি, হ্যাঁ S3, 44, LB আমারই…তবে ০৫.০১.১৬ দার্জিলিং মেলের নয়, ১০.০১.১৬ তারিখের পদাতিক এক্সপ্রেসের! অর্থাৎ ফেরার সময় আমাকে ওই বার্থে ফিরতে হবে। আর আমার আজকের অর্থাৎ যাওয়ার বার্থ S4, 52। সরি টরি বলে সব গুটিয়ে নিয়ে ছুটলাম পাশের কোচে। সেখানে গিয়ে সব রেখে দেখি স্লিপিং ব্যাগটাই নেই। ‘আত্মারাম খাঁচাছাড়া’ কথাটার আক্ষরিক অর্থ রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করতে করতে দরদর করে ঘামছি তখন। আমার এক পাহাড়ী বন্ধুর প্রাণের চেয়েও প্রিয় তার মাউন্টেনিয়ারিং গীয়ার্স। সেটা আমি হারিয়ে ফেললে মুখ দেখাতে পারব না আর! ট্রেন ছাড়তে আর তখন তিন মিনিট বাকী। ছুটে বেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে চেক করতে যাচ্ছি, কোথাও পড়ে গেছে কি না, তখনই দেখলাম ব্যাগটা ওখানেই পড়ে আছে। ভগবানের অস্তিত্ব না মানলেও সেই মুহূর্তে মনে মনে কাউকে একটা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছে করছিল।

সারারাত সমবেত নাকবাদ্য বা কনসার্ট শুনতে শুনতে দেখলাম ট্রেন ঢুকছে ‘মালদা’। তখন ঘড়িতে ৪:১৫। এভাবেই একসময়ে সকাল ৯:০৫ এন.জে.পি.। সেখান থেকে বেরিয়েই পেয়ে গেলাম শেয়ার জীপে। সামনের দুটো সিট ৫০০ টাকা দিয়ে বুক করে দুপুর ১:৩০ পৌঁছলাম ‘দেওরালি’ ট্যাক্সিস্ট্যান্ড। সেখান থেকে ১৫০ টাকায় রফা করে লোক্যাল ট্যাক্সিতে এলাম গ্যাংটকে, “হোটেল ডে-রা”। তিনমাস আগেই পুজোর সময়ে এসে থেকে গেছি এখানে। সেই সূত্রেই আলাপ বুদ্ধদার সাথে। আমি কবে কখন আসছি জেনে নিয়ে আমার জন্যে রুম, লাঞ্চ সব রেডি করে রেখেছিলেন এই নতুন বন্ধুটি। খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম ম্যালে।

এমনিতেই গ্যাংটকের মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহর আমি খুব একটা দেখিনি। পুরো রাস্তা, ম্যাল সব সেজে উঠেছে জিরেনিয়াম, প্যানজি এবং আরও অনেক নাম না জানা রঙিন ফুলের সম্ভারে। মাঝে মাথা তুলে উঁকি মারছে রকমারী গোলাপ। যেমন মনোরম তাদের রঙ, তেমন আকর্ষক তাদের পাপড়ির বিন্যাস। এক কথায় – অপূর্ব। বেশ কিছু গোলাপকে ফ্রেমবন্দী করে ফিরে এলাম হোটেলে। পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামীকাল বেরোতে হবে ইয়ুমথাং এবং গুরুদোংমারের উদ্দেশ্যে।

উত্তেজনায় ভোর পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল। কতদিনের জমিয়ে রাখা ইচ্ছে ইয়ুমথাং আর গুরুদোংমার লেক ঘোরার। সকাল দশটায় বেরনোর কথা, সাড়ে আটটায় বুদ্ধদার ফোন এলো, “একটা খারাপ খবর আছে ম্যাডাম। (আমার বুক ধুকপুক!) আপনার ইয়ুমথাং হচ্ছে, কিন্তু গুরুদোংমারের রাস্তা বরফ পড়ে বন্ধ। ওখানকার পারমিট দেওয়া হচ্ছে না”। মনে হল একটা বরফের চাঁই আমারই বুকের উপর রেখে দেওয়া হল। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। প্রকৃতির কাছে আমরা যে কতটা অসহায়, এভাবেই তা বারংবার প্রমানিত। পাহাড়ে অন্তত তার মর্জি ছাড়া চলা যায় না এক পা’ও। অগত্যা এ’যাত্রায় শুধুই ইয়ুমথাং!

অসম্ভব কাজের চাপের মধ্যেও বুদ্ধদা নিজে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেলেন ছাঙ্গু-লাচুং স্ট্যান্ডে, যেখান থেকে আমাদের গাড়ী ছাড়বে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার পেমা দাজু সব চেক করে গাড়ি ছাড়ল পাক্কা 11টায়। প্রায় দশ মিনিট যাওয়ার পর গাড়ী থামল ‘স্বস্তিক গেট’। সেখান থেকে দু’জনের ওঠার কথা। ফোন করে জানা গেল তারা নাকি এত দেরী দেখে চলে গেছে লাচুং স্ট্যান্ডে, মানে যেখান থেকে আমাদের গাড়ী ছেড়েছিল। গাড়ী ঘুরিয়ে যাওয়া হল স্ট্যান্ডে। আবার পেমা দাজু ফোন করলেন। এবার জানা গেল তারা আদৌ এখানে নাকি আসেইনি, ওখানেই হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রাগে গজগজ করতে করতে দাজু আবার গাড়ী ছোটালো স্বস্তিক গেটের দিকে। এবার আমরা বললাম যদি ওনাদের সাথে দেখা না হয় গাড়ী যেন সোজা লাচুং নিয়ে যায়। কারণ আমরা অলরেডি এক ঘন্টা লেটে গাড়ী ছেড়ে আবার এই যাতায়াতে আধা ঘন্টা নষ্ট করেছি। যাই হোক, এবারে ওনাদের পাওয়া গেল। উত্তর প্রদেশ থেকে এসেছেন সদ্য বিবাহিত এই দম্পতি। গাড়ী এগিয়ে চলল গন্তব্য অভিমুখে।

রাস্তা সাধারণ, তেমন কোন সৌন্দর্য নেই, তার উপর যথেষ্ট খারাপ। প্রায় ২৫ কিমি. রাস্তায় কাজ চলছে। তাই ধুলোয় ভর্তি রাস্তা ধরে প্রায় তিন ঘন্টা চলার পর আমরা পৌঁছলাম ‘নাগা’ বলে একটা ছোট্ট জনপদে। সেখানেই আমাদের লাঞ্চ ব্রেক। গাড়ীর নাম্বার বলে কুপন নিয়ে লাইন দিয়ে খাবার নিতে হল। খাবারের দাম প্যাকেজেই ধরা আছে। খেয়ে আবার পথ চলা শুরু। গ্যাংটক থেকে লাচুং মাত্র ১২৪ কিমি. হলেও সময় লাগে প্রায় ছয় ঘন্টা। রাস্তা অত্যন্ত খারাপ বলেই এতটা সময় লাগে। পথে দেখা হল ‘বাটারফ্লাই ওয়াটার-ফল্‌স্‌’-এর সাথে। গাড়ি থামিয়ে সামান্য সময়ের আলাপচারিতা সেরে আবার এগিয়ে চলি। বেলা দুটো নাগাদ লাঞ্চ করে প্রায় তিন ঘন্টা পরে পৌঁছালাম ‘চুংথাং’। এখানেই ‘লাচেন চু’ এবং ‘লাচুং চু’ হাত ধরাধরি করে এক হয়ে যায়… নাম হয় ‘তিস্তা’। লাচুং পৌঁছানোর প্রায় দেড় কিমি. আগে পড়ল এক বিশাল ঝর্ণা। এতটাই উঁচু থেকে সেই জলধারা সজোরে নীচে এসে পড়ছে যে পুরোটা দেখতে গেলে ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয়। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে ‘অমিতাভ বচ্চন ফল্‌স’। যদিও বিগ-বি স্বয়ং এলে তাঁকেও ওই ঘাড় উঁচু করেই দেখতে হত এই ঝর্ণাটিকে। এদিকে সন্ধ্যেও হয়ে আসছে। ঠান্ডা হাওয়ার সাথে ঝর্ণার কনকনে জলের ফোয়ারা হয়ে ছড়িয়ে পড়া জলকণার মেলবন্ধনে রীতিমত কাঁপুনি লাগে শরীরে। সোয়েটার এবং মোটা জ্যাকেট পড়েও হাওয়ায় ওড়া বাঁশপাতার মত কাঁপতে থাকি। পেমা দাজুর তাড়ায় ফটোসেশন ছেড়ে সবাই উঠে পড়ি গাড়িতে। পাহাড়ে তো অন্ধকার হতেও বেশী সময় লাগে না। দূর থেকে লাচুং-এর আলো দেখা দিতেই আমরা নড়ে চড়ে বসলাম। তখন ঘড়িতে সময় ছ’টা, কিন্তু বাইরে তাকালে মনে হচ্ছে রাত ন’টা/দশটা হবে। একটা লোহার ব্রীজ পেরিয়ে লাচুং-এ প্রবেশ করলাম আমরা।

ব্রীজ, লাচুং চু

৮,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লাচুং চু’র উপরে ছোট্ট ব্রীজটি পেরিয়ে আমরা উঠে গেলাম আমাদের রাতের আস্তানার দিকে। ‘থাংক্‌লিং রেসিডেন্সী’র প্রধান দরজায় বিরাট বড় সুদৃশ্য পিতলের কড়া। তার কারুকাজ দেখেই মন ভরে যায়। কাঁপতে কাঁপতে আমরা ঢুকে পড়লাম ভেতরে। এখানকার কেয়ার টেকার-কাম-কুক ‘রাজুভাই’ এসে আমাদের ঘর দেখিয়ে দিয়েই চলে গেল কিচেনে। সাধারণত এক ঘরে দুজন করে থাকার ব্যবস্থা। আমি যেহেতু একাই এসেছি, তাই প্যাকেজে দুজনের টাকা দিয়ে গাড়ির সামনের দুটো সিট এবং একটি ঘর শুধুমাত্র আমার একার দখলে। গরমজলে মুখ হাত ধুয়েই নেমে এলাম চায়ের আশায়। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নিজেদের মধ্যে আলাপ-পরিচয় সাঙ্গ হল।



দাজুর হাতে দিয়ে দেওয়া হল ৩০০০ টাকা জিরো পয়েন্ট যাবার জন্যে গাড়ীর খরচ। আমাদের প্যাকেজ অনুযায়ী ইয়ুমথাং ভ্যালী পর্যন্ত নিয়ে যাবার কথা। কিন্তু সেখানে গিয়ে জিরো পয়েন্ট যায় না, এমন ট্যুরিস্ট বোধহয় নেই বললেই চলে। পরদিন সকাল ছটায় গাড়ি নিয়ে আসবে বলে দাজু চলে গেল তার নিজের বাড়ী।

আমরা যে যার ঘরে ঢুকে পড়লাম। এখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের কোন সমস্যা নেই। ইন্টারনেট বিন্দাস দৌড়াচ্ছে। তবে মাঝে মাঝেই তিনি যে কোথায় দম নিতে যাচ্ছেন সেটা তদন্তসাপেক্ষ। আগামীকাল জিরো পয়েন্ট যাবার প্রয়োজনীয় জামাকাপড় বের করে একেবারে পরেই ফেললাম। ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাও হল, আবার কাজও এগিয়ে রইল। প্রথমে কটস-উল, তারপর ফুল টি-শার্ট, তার উপর ফুলস্লীভ সোয়েটার আর একদম উপরে মোটা জ্যাকেটের সঙ্গে কটসউলের প্যান্ট, উলেন লেগিংস আর তার উপর এয়ারপ্রুফ প্যান্ট পরে স্লিপিং ব্যাগে ঢোকার প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। এবার শুধু ডিনার করে এসে শুয়ে পড়ার অপেক্ষা। ডাব্‌ল উলের মোজা আর গ্লাভস পরেই খেতে নামলাম ঠিক আটটায়। গরম ভাত, ডাল, আলু-সোয়াবীনের তরকারি আর চিকেন কারি। এটাও প্যাকেজের মধ্যেই। স্বাদ দুর্দান্ত, পুরোটাই আন্তরিকতায় মাখামাখি। খাবার পর আমি ঢুকে পড়লাম রাজুভাইয়ের কিচেনে। জানতে চাইলাম টেম্পারেচার কত হবে? নিজের হাতঘড়িতে চেক করে রাজুভাই জানালেন, “আবি তো মাইনাস সেবেন হ্যায় ম্যাডামজী”। শুনেই বোতল থেকে যে জলটা খাচ্ছিলাম, সেটা যেন একটু বেশীই চিল্‌ড্‌ মনে হল। তাহলে রাত্রে কত হয়? রাজুভাইয়ের স্মার্ট উত্তর, “মাইনাস নাইনটিন তক হো যাতা হ্যায়। থোড়াসা বারিশ হো যানেসে আপকো তো ইয়েঁহি বরফ মিল যাতা”। সকালে যদি উঠতে না পারি, তাহলে ডেকে দিতে বলে ঘরে চলে এলাম।

রাতভোর দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। কিছুটা পরদিন জিরো পয়েন্ট যাওয়ার উত্তেজনায়, কিছুটা ভোরে যদি ঘুম না ভাঙে সেই টেনশনে এবং সবথেকে বেশী হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার দাপটে। বারবার মোবাইলে সময় দেখতে দেখতেই একটা সময়ে ঘড়ি জানান দিল ভোর পাঁচটা। আমি উঠে দেখলাম রাজুভাই উঠে পড়েছে। তাকে বলে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম একাই। বাকীরা তখন জোরকদমে বেরনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে একটা রাস্তার বাঁক ঘুরতেই চোখে পড়ল পাহাড়ের এক কোণে একফালি বাঁকা চাঁদ। ভোরের আলোয় চাঁদের দেখা… অসাধারণ সে দৃশ্য। হোটেলে ফিরে এসে দেখি তখনও অনেকে রেডি হয়ে উঠতে পারেনি। ওদের জানিয়ে আমি এগিয়ে চললাম লাচুং চু’র দিকে। ঠিক হল, আমাদের গাড়ি ওখান থেকেই আমাকে তুলে নেবে। কিছুক্ষণ লাচুং নদীর ধারে বসে এবং শুয়ে প্রকৃতির সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে দিতেই কানে এল পেমা দাজুর গাড়ির হর্ন। তাড়াতাড়ি দৌড়লাম সেদিকে।

লাচুং থেকে বেরিয়ে রাস্তা ক্রমশ পাথুরে, বোল্ডারময়। কাছে এবং দূরে বিভিন্ন আকারের পাহাড়ের রঙ ধূসর থেকে বাদামী হয়ে ক্রমশ কালো। অন্যান্য পাহাড়ী পথের মতই এঁকেবেঁকে ক্রমশ উঠতে থাকি আমরা। কিন্তু এই পথ রুক্ষ। পথের দুপাশে রডোডেন্ড্রন গাছের চিহ্ন আছে বটে, কিন্তু এই প্রবল শীতে ফুলের কোন অস্তিত্বই নেই। ফুল দেখতে হলে এখানে আসতে হবে এপ্রিল-মে মাসে। সেই সময় পুরো ইয়ুমথাং ভ্যালিই রঙের বন্যায় ভাসতে থাকে। তাই একে ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ও বলে।

স্থানীয় ভাষায় “থাং” অর্থাৎ ভ্যালি বা উপত্যকা। ‘চুং’ মানে ছোট এবং ‘ইয়ুম’ মানে বড়। তাই চুংথাং হল ছোট উপত্যকা এবং ইয়ুমথাং হল বড় উপত্যকা। আমরা ইয়ুমথাং-এর দিকে যেতে যেতেই চোখে পড়ল রাস্তার ধারে বরফ পড়ে আছে। দূরে পাহাড়ের গা থেকে ঝুলে আছে বরফায়িত ঝর্ণা। পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে চলেছে “কিপ ছঅ” নদী। তার পান্নাসবুজ জলের বুকে সাদা বরফের চাদর…যার সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

বরফায়িত ঝর্ণা

কিন্তু আমাদের থেমে থাকলে চলবে না। আর সেটা মনে করিয়ে দেবার জন্য আছেন পেমা দাজু। তাঁর তাড়ায় আবার গাড়িতে উঠে বসা এবং দুপাশে পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা কঠিন ঝর্ণা এবং ছোট বড় অজস্র বোল্ডার দেখতে দেখতেই এক ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম লাচুং থেকে ২৪ কিমি. দূরে ইয়ুমথাং (১১,৮০০ ফুট)। কয়েকটি অস্থায়ী দোকানঘরে চা-টোস্ট-ম্যাগির গন্ধে হঠাৎ করেই মনে হল ব্রেকফাস্ট করা হয় নি। এখানেই সামান্য খাওয়া দাওয়া সেরে দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম লাচুং চু’র শুকনো নদীখাতে সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো নীল-সাদা-হলুদ-সবুজ প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। দূরে পাহাড়ের বুকে তুষারের আস্তরণ। এখান থেকে দেখা যায় দূরে অবস্থিত পাহাড়চূড়া, যাদের স্থানীয় নাম ‘পাওহুনরি’ এবং ‘শুনদু শেনপা’। আমাদের হাতে সময় বেশী নেই। জিরো পয়েন্ট থেকে ফিরে আমাদের আজই সন্ধ্যের মধ্যে পৌঁছতে হবে গ্যাংটক।

ইয়ুমথাং ভ্যালি

ইউমথাং থেকে প্রায় ১৯ কিমি. দূরে ১৫,৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ইউমেসেমডং চীনা সীমান্তের একেবারে কাছেই। রডোডেনড্রন গোত্রীয় অ্যাজালিয়া ফুলের গাছ ভর্তি এখানে। এর সুমিষ্ট গন্ধে চারিপাশ মাতোয়ারা হয়ে থাকে। ইউমেসেমডং-এই শেষ বসতি। তাই একে ‘জিরো পয়েন্ট’ বলা হয়। আর্মি এরিয়ার সুন্দর করে সাজানো পাথরের ঘরগুলো ছেড়ে এগিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ল একটা বিশাল পাথরের গায়ে সাদা রঙ দিয়ে লেখা –

“I don’t stop when I’m tired
I stop when I’m done.”

মনে মনে সেই আর্মিম্যানদের উদ্দেশ্যে একটা স্যালুট জানালাম। তারা আছে বলেই আমরা এমন নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে একাই ঘুরতে আসতে পারি এমন একটা জায়গায়।

আরও দু কিমি. এগিয়ে জিরো পয়েন্ট। সেখানে পৌঁছে সকলেই লাফালাফি করে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। জানুয়ারির প্রবল ঠান্ডায় গাড়ি থেকে নামতেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি লাগিয়ে দিল। বরফজমা নদীর বুকে নেমে গিয়ে সবাই তখন ফটো তোলাতে ব্যস্ত। আমিও একপাশে পাথরের উপর বসে দূরে বরফমোড়া পাহাড়চূড়ার দিকে তাকিয়ে অনুভব করলাম…যেটুকু এই দু’চোখে ভরে নিতে পারি, সেটুকুই সাথে যাবে। বাকী সবকিছুই ফেলে যেতে হবে এখানেই।

জিরো পয়েন্ট

পেমা দাজুর তাড়ায় সকলেই একবার করে গাড়ির কাছে আসে, গ্লাভস খুলে হাতে হাত ঘষে হাত গরম করে নিয়েই আবার দৌড়ে চলে যায় বরফ নিয়ে ছোঁড়াছুড়ি করতে। এমন একটা জায়গায় এলে যে প্রৌঢ়ত্বেও শৈশব ফিরে আসে তা প্রত্যক্ষ করলাম আরও একবার। কিন্তু এবার আমাদের ফিরতেই হবে। ঠান্ডায় আঙুল শক্ত হয়ে উঠছে নিমেষে।

আমরা গাড়িতে উঠতে যেতেই দেখি ঝুরঝুর করে তুষারপাত হতে শুরু করেছে। ব্যাস, এবারে পেমা দাজুও হার মেনে গেল আমাদের আনন্দে লাফালাফি দেখে। মুহূর্তের মধ্যে সকলে সাদা তুষারের চাদরে ঢাকা পড়ে গেলাম। কিন্তু না, দাজু আর কোন কথাই শুনতে রাজী নয়। তাকে যে সময়মত সবাইকে নিয়ে নিরাপদে গ্যাংটক পৌঁছতেই হবে। এদিকে তুষারপাতের ফলে রুক্ষ পথ পুরো ঢাকা পড়ে গেছে বরফে। আসার পথে যাদের নিজস্ব রঙে দেখে এসেছি তারা সবাই এখন শ্বেতবস্ত্রাবৃত।

কিছুদূর যাওয়ার পরে অনেক অনুরোধ করে পেমা দাজুকে গাড়ি থামাতে রাজী করা গেল…কিন্তু শুধুমাত্র দশ মিনিটের কড়ারে। সেলফি, ভিডিও রেকর্ডিং আর চারপাশের তুষারে ঢেকে যাওয়া গাছের ডাল, পাথর সবকিছু বন্দী হয়ে যেতে লাগল মোবাইলে। আবার দাজুর তাড়ায় গাড়িতে চেপে বসতে হল। উইন্ডস্ক্রীন মুহূর্তের মধ্যে ঘন তুষারে ঢেকে যাচ্ছে, ওয়াইপার তার কাজ করে চলেছে শুধু। রাস্তাও ভালভাবে দেখা যাচ্ছে না। এভাবে গাড়ি চালানো কতটা বিপজ্জনক সামনের সিটে বসে আমি তা ভালভাবেই অনুভব করতে পারছি।

সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। আমরাও এক সময়ে ফিরে এলাম লাচুং-এ, আমাদের হোটেলে। এখানেই লাঞ্চ করে ব্যাগপত্তর নিয়ে আমরা রওনা হলাম গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে। মনটা ভরে আছে এক অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতায়। এর আগেও একবার মানালিতে তুষারপাত পেয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে কনকনে হাওয়ায় বাঁশপাতার মত কাঁপতে কাঁপতে “ওলে” মাখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। কিছু কিছু দৃশ্য চিরস্থায়ী হয়ে যায় মনের মণিকোঠায়। জিরো পয়েন্টের এই তুষারপাত তাদের মধ্যে অন্যতম।

কিভাবে যাবেনঃ এনজেপি থেকে নিজস্ব ভাড়াগাড়ি বা শেয়ার জিপে গ্যাংটক। সেখানে বিভিন্ন ট্র্যাভেল এজেন্টের মাধ্যমেই বুক করতে হয় লাচুং-ইয়ুমথাং অথবা লাচুং-ইয়ুমথাং-গুরুদোংমার প্যাকেজ। গ্যাংটক থেকে গ্যাংটক ফেরা পর্যন্ত সবকিছুই প্যাকেজের মূল্যে ধরা থাকে।

যাওয়ার সময়ঃ ফুল দেখতে হলে যেতে হবে এপ্রিল থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ঠান্ডায় ঘোরা যায় বরফে মোড়া পাহাড় দেখতে দেখতে। জানুয়ারি থেকে মার্চ ঠান্ডার জন্য যথেষ্ট পরিমানে শীতের পোশাক নিয়ে যাওয়া জরুরি। লাচুং এবং ইয়ুমথাং বরফে ঢাকা থাকে এই সময়ে।

Facebook Comments