কেন বাড়ছে মাল্টিপল রিলেশনশিপ?

রুমুন চক্রবর্তী

যুগের পরিবর্তন সবচেযে বেশি প্রভাবিত করে মানুষের মনকে। আর তারই প্রভাব পড়ে জীবনযাত্রায়। সময়ে সাথে সাথে বদলে যায় সম্পর্কের ডেফিনেশন। প্রতিনিয়ত বং বদলাচ্ছে স্বামী-স্ত্রী বা নারী-পুরুষের এককান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও। নারী বা পুরুষের একাধিক সম্পর্কে লিপ্ত হবার প্রবনতা মারাত্মকভাবে দেখা দিচ্ছে এই শতাব্দীতে। সে সম্পর্ক শুধু যে শারিরীক তা নয়, একটি সমীক্ষা বলছে এখন বেশিরভাগ প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীরাই একটি সম্পর্কের পাশাপাশি একাধিক মানসিক সম্পর্ককে ক্যারি করে। যাকে এক কথায় বলা হচ্ছে মাল্টিপল রিলেশনশিপ।

যদিও ইতিহাস সাক্ষী আছে যে আদিকাল থেকেই নারী ও পুরুষ উভয়ে মধ্যেই যেমন একগামিতা দৃশ্যমান, তেমনই বহুগামিতাও। এদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরির আকাঙ্ক্ষা যেমন আছে, তেমনই সুযোগ এবং পরিস্থিতিভেদে জন্ম নেয় স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কের মনবাসনাও। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক অর্থাত্ পরকীয়া বহু প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সমাজে বিদ্যমান। নারী-পুরুষ নির্বিশেষের বিবাহোত্তর শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত থাকার কথা আমাদের কারোর কাছে অলীক বা অজানা ঘটনা নয়। কিন্তু আগে সেটা একটা বা দুটো সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন তা খানিকটা সামাজিক ব্যধির আকার নিয়েছে বলা চলে। আর তাছাড়া ইদানিং নারী-পুরুষ উভয়ে অনেকেই পার্মারেন্ট একটি সামাজিক সম্পর্কের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছেন একাধিক মানসিক সম্পর্কে, যা মানুষের মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দিনকেদিন পারস্পারিক বন্ধনের দূরত্ব বাড়ছে। আলগা হচ্ছে মূল্যবোধের চাবিকাঠি। বাড়ছে সু্য়ইসাইড। আর বিবাহিতদের ছোট শিশুটি শিকার হচ্ছে এই অসামাজিকতার।

এই একধিক মানসিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবনতা এক মারাত্মক ব্যাধি। একটু উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। ধরা যাক একজন পুরুষ তার স্ত্রী বা প্রেমিকার সাথে শারীরিক এবং মানসিকভাবে যথেষ্ট পরিপূরক জীবন কাটাচ্ছেন। তবু কোন কোন বিশেষ মুহূর্তে জীবনে অন্য কোন এক বা একাধিক নারীর উপস্থিতি কামনা করছেন। এমনকি একই সময়কালের মধ্যে হয়ত বেশ কয়েজন নারীর সাথে তাঁর গভীর সম্পর্কও গড়ে উঠছে যাঁদের সাথে দেখা করতে, ফোনে কথা বলতে বা সময় কাটাতে তিনি পছন্দ করেন। কারোর কারোর ক্ষেত্রে অবশ্য এই ভালোলাগা বাস্তবায়িত হচ্ছে না শারীরিক উপস্থিতির মধ্যে দিয়ে সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি কেবল মানসিকভাবে জড়াচ্ছেন এমন সম্পর্কে। একই ঘটনা ঘটছে নারীদের ক্ষেত্রেও। তাঁরাও খুঁজে নিচ্ছেন নিত্য নতুন মানসিক সঙ্গী।

এমনও দেখা যাচ্ছে যে কোন একটা সময়ে একজন বান্ধবীর সাথে বসে হয়ত গল্প করছেন কোন পুরুষ, কিন্তু ঠিক ওই মুহূর্তে তাঁর মন ভাবছে অন্য এক নারীর কথা। তাঁর মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে সে পাশে থাকলে কেমন অনুভূতি হত! বা হয়ত তাঁর মনে এমন ভাবনাও আসছে যে যাকে নিয়ে রোড সাইড স্টলে দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চা খেতে খেতে গল্প করা যায় তাঁকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় বসে লাঞ্চ অথবা ডিনার করা যায় না। যাঁকে নিয়ে ঝাঁ চকচকে মলে শপিং করা যায় তাঁকে নিয়ে সিনেমা হলের একদম লাস্ট রোতে বসে সিনেমা উপভোগ করা যায় না। কেউ গান শোনায় সঙ্গ দেওয়ার উপযুক্ত তো কেউ কবিতা পড়ায়। কেউ বা আবার ভালো নাটক দেখার যোগ্য পার্টনার। মোটকথা একটা মানুষের সাথে দীর্ঘ সম্পর্কে আগ্রহী থাকার প্রবনতা কমছে। বৈচিত্র‌্য খুঁজতে মানুষ মরিয়া।

এটা ইন্টারনেটের যুগ। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোর দৌলতে হাত বাড়ালেই বন্ধু। হোক না ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড, তবু তো সঙ্গী। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বেষ্টনীতে মেসেজের মাধ্যমে মুহূর্তে আদানপ্রদান হয়ে যাচ্ছে হাজারো না বলতে পারা কথা। সুপ্ত ইচ্ছের বীজ যে যার মতো ছড়িয়ে দিচ্ছেন মনের ভেতর। অডিও কল, ভিডিও কল- নামমাত্র খরচে। এসব সুবিধে মানুষকে প্রতিনিয়ত ঠেলে দিচ্ছে স্বাদ বদলের উন্মাদনার দিকে। এটা অনস্বীকার্য যে বাস্তব জীবনে একটি পার্মারেন্ট রিলেশনশিপে থেকে অন্য কোনও সম্পর্ক বা বিবাহবহির্ভূত যে কোন সম্পর্ক যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তবু এই মানসিক চাহিদার খাতিরে তৈরি হওয়া সামান্য বাস্তবায়িত সম্পর্কগুলো দমকা হাওয়ার মতো। যা শুধু জীর্ণতা উড়িয়ে নিয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন ওঠে এমনভাবে একই সময়কালের মধ্যে কেন মানুষ একাধিক সম্পর্কে জড়াচ্ছেন? এর মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণই বা কী? সমীক্ষায় দেখা গেছে একঘেয়ে ক্লান্তিকর এবং প্রায় অর্থহীন একটা সম্পর্কের মধ্যে থাকতে থাকতে অনেকেই তাঁর প্রিয় আমিকে হারিয়ে ফেলেন। সেই আমিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পথ যে দেখায় বা যাঁর সান্নিধ্যে তা ফিরে পাওয়ার আশা সঞ্চারিত হয়, সেখানেই স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এই সম্পর্ক শুধু মানসিক স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর যাঁরা কিঞ্চিত্ সাহসী, তাঁরা সামাজিক নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেতে ওঠেন সম্পর্কের আপাত কার‌্যকরী অথচ ফলাফলহীন খেলায়।

অনেকের কাছে আবার শুধুমাত্র জৈবিক কারণই মুখ্য। কেবলমাত্র সেক্স, সময় কাটানো, ক্ষণিক ফুর্তি, দামি উপহার, ক্যারিয়ারে লিফট পাওয়া ইত্যাদিই এসব মানুষকে বিপরীত লিঙ্গের কাছাকাছি নিয়ে যায়।



কোনো কোনো নারী, যাঁরা সংসারে স্বাধীনতা বা তাঁদের কাজের সম্মানজনক স্বীকৃতি পান না, তাঁদের দিক থেকে এমন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা হতে পারে তাঁর স্বাধীন সত্তার স্বীকৃতির কামনায়।

অবহেলিত বা অত্যাচারিত পুরুষও মানসিক শান্তির লোভে জড়িয়ে পড়েন এমন সম্পর্কে।

কেউ কেউ মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে একটু আধটু এই ধরনের সম্পর্ক নারী পুরুষ উভয়ে জন্যই ভালো। এতে মনের পরিধি বাড়ে, মানসিক চাপ হালকা হয়। উদ্যম বাড়ে। কাজে গতি আসে। ডোমেস্টিক পার্টনারশিপে দুটো মানুষ একে অপরের প্রতি একদম একশো শতাংশ বিশ্বস্ত থাকবে  এটাই এঁদের কাছে একটা অস্বাভাবিক ঘটনা, আদতে মনোবিজ্ঞান বলে এটি একটি মানসিক রোগের প্রকাশ।

বাস্তবে বিবাহ পরবর্তী দাম্পত্যের সম্পর্কে কারোর পক্ষেই অপর পক্ষের সব ধরনের মানসিক বা শারীরিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। আর এই অবাস্তব আকাঙ্ক্ষার কারণে সৃষ্ট হয় তীব্র ইনসিকিউরিটি বোধ। তখনই শুরু হয় একাধিক সম্পর্কের প্রতি ঝোঁকবার প্রবণতা।

একথা সত্যি যে সব মানুষই চায় ভালোবাসতে ও ভালোবাসা পেতে। কিন্তু যাঁরা আজীবনের অঙ্গীকার থেকে বের হয়ে এক বা একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, শেষ অবধি কিন্তু তাদের তৃষ্ণা কোনদিনই মেটে না। এমন আচরণের পেছনে যে মনস্তাত্বিক কারণ নিহিত থাকে, ব্যক্তিজীবনের মধ্যেই তার মূল খুঁজে পাওয়া যায়। যখন কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের অসামঞ্জস্যতার কারণে এমন ঘটনা ঘটে, সেই ব্যক্তির প্রয়োজন নিজেকে জানা, নিজেকে চেনা। খুঁজে বার করা কোথায় তাঁর খামতি। কারণ একাধিক মানসিক বা শারীরিক সম্পর্ক কখনই কোন সমস্যার সমাধান হতে পারে না। সম্পর্ক একটি সামাজিক বন্ধন। যেখানে স্বাভাবিকতা বা স্বতস্ফুরতা থাকা আবশ্যক। স্বাভাবিকতা শব্দটি একটি আভিধানিক শব্দে পরিনত হলে জীবনে যে মানুষগুলো সুখ খোঁজেন বা খুঁজছেন তাদের ভবিষ্যতে অতপ্তির ভান্ডার ছাড়া কিছু রাখা নেই।

Facebook Comments