অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে যা যা করতে হবে…

অবসাদ শব্দটা কারোরই অজানা-অচেনা নয়। জীবনে যে কোনো সময় বা কয়েকবার সকলেই অবসাদের খপ্পরে পরেছে। কারোর কারোর পুরো জীবনটা পালটে যায় এই অবসাদে। পড়াশোনা, কাজ, প্রেম-বিয়ে, সংসার, সন্তান হাজার একটা সূত্র থেকে অবসাদ হঠাৎ নিজেদের কব্জা করে নিতে পারে। অবসাদ শুধু সাধারণ মনখারাপ বা বিষণ্ণতা তো নয়, এমন মনের অসুখ যে মনকেই কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। সঙ্গে শরীরে দানা বাঁধে নানা রোগ। মাথাব্যথা, পেটের রোগ তো খুব সাধারণ উপসর্গ। আরও কত কী যে হতে পারে এই অবসাদ থেকে তার কোনো হিসেব হয় না। জন্ম নিতে পারে নানা বদভ্যেস, নেশার প্রতি আসক্তি, প্রতিহিংসা, আত্ম হিংসা কত কী! এসব হয়ত শুরুতেই ভাবা যায় না, কারোর আজকের ছোটো মনখারাপ, বা আজকে তৈরি হওয়া বিরক্তি দিনে দিনে কাওকে এতটা গ্রাস করে ফেলবে যে এর থেকে বেরিয়ে আসা মুশকিল হবে। ওয়ার্ল্ড হেলথ্‌ অর্গানাইজেশন জানিয়েছে যে: অবসাদ জনিত ভারসাম্যহীনতা প্রায় ৫% প্রাপ্ত-বয়স্ক জনসাধারণের মধ্যে তাদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে দেখা যায়। আবার অবসাদ না কি, ২০২০ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মানসিক রোগের আকার ধারণ করবে। একথা শুনলে আরও চমকাতে হয় যে ভারতে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বেশি মাত্রাতে অবসাদের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপরাধমূলক খবর থাকে যার কারণ অবসাদ। এতে ছোটোরাও বেশিমাত্রায় জড়িয়ে পড়ছে। তাই অবসাদ-বিষয়টা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে সব সচেতন মানুষকে।  অবসাদ যে নিজেদের কত ক্ষতি করে তা জানলে বোধহয় অবসাদকে নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়। বেশিরভাগ সময় মনখারাপ লাগা, কোনও কিছুতেই উৎসাহ না পাওয়া ও রোজকার কাজ করতে উৎসাহ হারানো, সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, ঘুমোতে না পারা, ভালো-লাগা জিনিসগুলোতেও বিরক্তি জন্মানো খুব সাধারণ লক্ষণ। এমনটা হলেই বুঝবেন মনে এমন কিছু চলছে যা থেকে অবসাদ তৈরি হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে মনঃসংযোগ ও চিন্তা-ভাবনা করার বা সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা কমতে থাকে, আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি, নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। মজার কথা হল অনেকেরই ধারণা আছে যে অবসাদে লোকে খাওয়া ছেড়ে দেয়। কিন্তু না। বেশি খাওয়াও অবসাদের লক্ষণ হয়। সব কিছুতেই নিজেকে দোষী মনে করা বা অযোগ্য মনে করা আরেকটি মনের ভাব যা ক্রমে অতি সাধারণ কাজ করাতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অবসাদ কিন্তু আমাদের এমন দিকে ঠেলে নিয়ে যায় যে আমরা হাজার চেষ্টা করেও এর থেকে নিজেকে সরাতে পারি না। তাই একা এর মোকাবিলা করতে থাকলে সময় নষ্ট হতে পারে। বরং চট জলদি ডাক্তারের পরামর্শ মতো চলা যেতে পারে। এতে লড়াইটা সহজ হয়। চিকিৎসা পদ্ধতি বা থেরাপির সঙ্গে সঙ্গে নিজের খেয়াল রাখাটাও খুব দরকার। এটা সহজ নাও হতে পারে, কিন্তু রোজের রুটিনে সামান্য পরিবর্তনও ইতিবাচক দিক এনে দেয়।

নিজের সম্পর্কে ধারণা নিজেকেই পালটাতে হয়। ছোটোখাটো কাজে হলেও নিজের সাফল্যকে চেনা দরকার। এতে আত্মবিশ্বাস বারতেই থাকে। নিজেকে সারাক্ষণ ভুল ভাবা, অদরকারী ভাবা, অপ্রয়োজনীয় ভাবা হল অবসাদের লক্ষণ। এই সব চিন্তা ভাবনাকে আটকানো এবং তার সাথে কোনো অবস্থাতেই যাতে এই সব চিন্তা-ভাবনা মনে আসতে না পারে সেই ব্যাপারে সচেতন থাকা প্রয়োজন। নেতিবাচক চিন্তার ধরণকে চিনে তাকে ইতিবাচক বা কনস্ট্রাকটিভ চিন্তাতে পরিবর্তিত করা গুরুত্বপূর্ণ।  যদি সম্ভব হয়, এই সব চিন্তাগুলো নোট করা ও এটা লক্ষ্য করা কীভাবে সেগুলোকে সুখের চিন্তা বা অনুভূতিতে রূপান্তরিত করা যায়।

কাজকর্মের মধ্যে থাকাটা অবসাদের থেকে মুক্তি পাওয়ার থেরাপির একটা অঙ্গ। রোজ ছোটো ছোটো গোল বা টার্গেট স্থির করে কাজ শেষ করতে পারলে আনন্দ পাওয়া যায়। পজিটিভ এনার্জি অবসাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। খুব সাধারণ ঘরোয়া কাজ যেমন, গাছের পরিচর্যা, রান্না-বান্না, ঘর গোছানো, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় সাহায্য, বাড়ির লোকেদের দেখভাল, নতুন কিছু বানানো, ইত্যাদি করতে পারলে মনে বেশ ফুরফুরে ভাব আসে। গবেষণাতে দেখা গেছে যে ব্যায়াম শরীর ও মনের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

যেহেতু অবসাদ ঘুমের প্যাটার্নকে পরিবর্তিত করে, তাই রোজই সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা ও প্রতিদিন রাতে একই সময়ে ঘুমানো দরকার। হতে পারে প্রথমে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হল। কিন্তু নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে যাতে ওষুধের সাহায্য না নিতে হয়। ঘুমের সময় পাওনা-গণ্ডার সব হিসেব সরিয়ে শুধু মনোনিবেশ করুন নিজের সুখের দিকে। যাতে শান্তি আপনার ঘুমকে আরও গাঢ় করতে পারে। গান শোনা ভালো সাহায্য করে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে গল্পের বই পড়া সকলের ক্ষেত্রে ভালো ঘুমের ওষুধ নয়।

যদি নিজের নিত্য নৈমিত্তিক কাজে কিছুটা স্থিতি আনা যায় তবে অবসাদ আপনা থেকেই দূরে পালায়। এই কাজের পুরোটাই একা সম্ভব হয় না। ডাক্তার ছাড়াও পরিবার, বন্ধু বা স্বজনদের সাহায্য লাগে। কিন্তু সকলেই তো আর তেমন আপন জন পায় না। সেখানে এটাই ভাবা দরকার যে হয়ত কেউ না থাকাটা আপনার পক্ষে ভালোই। আপনি এর ভালো দিকগুলোই ভাবুন। পরিবার অনেক সময় হাসি, তামাশা, আঘাত দিয়ে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াতে বড়ো ব্যঘাত তৈরি করে। তার থেকে নিজের লড়াই নিজে চালিয়ে যাওয়ায় কোনো খেদ নেই। এতে আপনারই ভালো।

Facebook Comments