চুমু থেকে লিপলক- যেভাবে সিনেমায় এলো কিসিং কেমিস্ট্রি

প্রতীপ হালদার

সিনেমা মানে উন্মাদনা, সিনেমা মানে কখনও কখনও বিতর্কও। আর সিনেমাতে চুমু একটা বিশেষ ফ্যাক্টর। চুমু নিয়ে কথা উঠলেই সেই উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে অর্থাৎ কুড়ি বা তিরিশের দশকে ফিরে যেতে হয়। তখনই একটা ক্যাপশন মনে আসে ভারতীয় সিনেমায় প্রথম চুমু। উরিব্বাস! দেবিকা রানি অতখানি উপুড় হয়ে!!! হ্যাঁ ছবির নাম ‘কর্মা'(১৯৩৩), বলা হয় এটাই নাকি প্রথম সিনেমা যেখান থেকে একটু জমাটি গোছের চুমুর অধ্যায় শুরু হল। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে এর আগেও সিনেমায় ঘটে গেছে দুঃসাহসিক পালাবদল। ১৯৩৩-এর আগে এসেছিল ‘মারাথান্দা বর্মা’। মালায়ালাম ছবি। ডিরেক্টর পিভি রাও। সেখানে চুমু ছিল। ১৯৩১-এ এসেছিল জামাইবাবু। বাংলা ছবি। ডিরেক্টর কালিপদ দাস। সেখানেও চুমু ছিল। আর তারও আগে অবশ্য ১৯২১-এ এসেছিল বিলাত ফেরত। ডিরেক্টর এনসি লাহিড়ী।

সেই সময় চারদিকে ঝড় ওঠে। গেল গেল রব। যেন মান ইজ্জত সব গেল। তবে ‘কর্মা’ ছবিতে দেবিকা রানি আর হিমাংশু রায়ে রেকর্ড সোরগোল ফেলে দিয়েছিল বিভিন্ন মহলে। চার মিনিটের লিপ-লক! ভাবা যায় সেই সময়ে দু-জনে শুটিং-এর পর ইনহেলার নিয়েছিলেন কিনা, কে জানে! এই সিনেমার পরই শুরু হয়ে গেল সমালোচনা। গেল গেল রব সর্বত্রই। এ উদ্বেগ প্রকাশের ধরন এমন, যেন আবহমান ঐতিহ্যের মুখে চুনকালি!

রব উঠলো- বন্ধ হোক কুরুচি। বন্ধ হোক এই বেরেল্যেপানা। এমনই হয়েছিল সেদিন, বলিউডে চুমুর প্রথম দৃশ্যায়নে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যকে নষ্ট করবে বলে আর্তনাদ হয়েছিল খুব। সেইসময় দাঁড়িয়ে ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের কারণে চুমুতে চলেছে কাঁচি। ১৯৩০-এ সেন্সর বোর্ডের হেইজ কোড অনুসারে কাপলদের পর্দায় হরাইজন্টাল পজিশনে মানে একে অপরের উপর শুয়ে কিস করায় ছিল নিষেধাজ্ঞা। এমনকী, বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীকে খাটে পাশাপাশি শুয়ে দেখানোর ক্ষেত্রেও অনেক শর্ত ছিল। যেমন খাটে চুমুর দৃশ্য দেখাতে হলে, এমনি শর্ত ছিল যে কাপলদের মধ্যের যে কোনও একজনের পা মাটিতে থাকতে হবে। ওই কোড অনুযায়ী সর্বাধিক দীর্ঘ চুমুর সিন হতে পারে ৩ সেকেণ্ডের, তার বেশি কোনও মতেই না। এত নিয়ম মেনেই চলত পর্দায় প্যাশনের বিস্ফোরণ।

এবার আসা যাক এ যুগের চুমুতে। বলিউডের প্রায় সব রোমান্টিক সিনেমাতেই এখন চুম্বন দৃশ্যের দেখা মেলে। তবে চুমুর কথা উঠলে যার কথা সবার আগে মনে আগে সে হল বলিউডের সিরিয়াল কিসার ইমরান হাশমি। ‘মার্ডার’, ‘জেহের’, ‘আশিক বানায়া আপনে’, ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় কখনও মল্লিকা শেরাওয়াত কখনও বা তনুশ্রী দত্ত, আবার কখনও কঙ্গনা রানাওয়াত- চুম্বন দৃশ্য থেকে অন্তরঙ্গতার অভিনয়ে জন্য অনেকেরই হার্টথ্রব ইমরান হাসমি। ইমরানের সিনেমা মানেই সুন্দরী নায়িকাদের সঙ্গে চুম্বনের দৃশ্য থাকবেই। তবে বলিউডে এমন অনেক অভিনেতা রয়েছেন যারা তাদের কেরিয়ারের প্রথম দিকে হয়তো পর্দায় চুমুর দৃশ্য করেননি। কিন্তু পরবর্তীতে এসে ঠিকই নায়িকার সঙ্গে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়েছেন। এমনকী কেরিয়ারের প্রথম দিকে কোনও নায়িকাকে চুমু খেতে দেখা যায়নি অমিতাভ বচ্চনকেও। এই অভিনেতা ষাট বছর বয়সে এসে সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত ব্ল্যাক সিনেমায় রাণী মুখার্জিকে প্রথমবার চুমু খেলেন। পরবর্তীতে রাম গোপাল ভার্মার নিঃশব্দ সিনেমায় জিয়া খানকে চুমু খেয়ে বিতর্কিত হয়েছিলেন বিগ বি। বছর দুয়ে আগে ২৫ বছরের অভিনয় ক্যারিয়ারে শিবায় সিনেমায় এরিকা করের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সরাসরি চুমুতে দেখা গেছে অজয় দেবগনকে। আর ২৫ বছর অভিনয় কেরিয়ারে এর আগে খাকি সিনেমায় ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, ওমকারা সিনেমায় কারিনা কাপুর এবং ইউ মি অউর হাম সিনেমায় কাজলের সঙ্গে চুমুর দৃশ্যে দেখা গেলেও এবারই প্রথম কোনও অভিনেত্রীর সঙ্গে লিপ লক করতে দেখা গেছে সেই অজয়কে। শিবায় সিনেমায় পর নন কিসার তকমাটা ভেঙে ফেললেন অজয়। অনেকে অবশ্য এব্যাপারে বলছেন, দর্শক আজকের দিনে চাইছে এইসব মনভরানো উত্তেজনা।

বলিউড বাদশা শাহরুখ খান -মায়া মেমসাব সিনেমায় দীপা সাহিকে প্রথম চুমু খেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দৃশ্যটি বাদ দেওয়া হয়। তবে তারপরও যতটুকু অবশিষ্ট ছিল সেই দৃশ্যটিও বেশ উত্তেজকপূর্ণ। পর্দায় শাহরুখের প্রথম চুমু হিসেবে ধরা হয় ক্যাটরিনা কাইফের সঙ্গে যশ রাজের জাব তক হ্যায় জান ছবির চুম্বন দৃশ্যগুলোকে। এখন অবশ্য বলিউডের খিলাড়ী অক্ষয় কুমারের চুম্বন দৃশ্যে কিছুটা আপত্তি দেখা যায়। এমনকি রুস্তম সিনেমায় ইলিযোর ডিক্রুজের সঙ্গে একটি চুম্বন দৃশ্যও বাদ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু অভিনয় কেরিয়ারের প্রথম দিকে এ ব্যাপারে তার কোনও বাধা ছিল না। এই  অভিনেতা নায়ক হিসেবে তার প্রথম সিনেমা সুগন্ধ-তে নায়িকা শান্তিপ্রিয়াকে চুমু খেয়েছিলেন নির্দ্বিধায়। আবার বলিউডের খান ত্রয়ী শাহরুখ, সালমান এবং আমিরের মধ্যে একমাত্র আমির খানেরই পর্দায় চুমু নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। যুবক বয়সে তার প্রথম সিনেমা কেতন মেহতার হোলি। এই ছবিতেই প্রথম চুম্বনদৃশ্যে অভিনয় করেন তিনি। এতে টিভি অভিনেত্রী কিতু গিরওয়ানির সঙ্গে চুম্বন দৃশ্যে দেখা যায় আমির খানকে।

আর এক অভিনেতা শহিদ কাপুর ব্রেকআপের আগে কারিনা কাপুরের সাথে বেশ কয়েটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু ব্রেকআপের পর এ জুটির প্রথমবার সিনেমা জাব উই মিট-এ পর্দায় চুম্বন দৃশ্যে দেখা যায় তাদের। এটিই ছিল শহিদের পর্দায় প্রথম চুমু। এরপর আর এক আইকন হল হৃতিক রোশন। ডেবিউ সিনেমাতেই অভিনেত্রী আমিশা প্যাটেলের সঙ্গে চুম্বন দৃশ্যে দেখা গেছে হৃতিককে। সিনেমায় নির্জন একটি দ্বীপে আমিশাকে চুমু খেয়েছিলেন এই অভিনেতা। তবে এ অভিনেতার সবচেয়ে আবেগঘন চুমু ছিল ধুম-টু সিনেমায় ঐশ্বরিয়ার রাই বচ্চনের সঙ্গে তার চুম্বন দৃশ্যটি। আবার রনবীর কাপুর প্রথম সিনেমা সাওয়ারিয়া-তে সোনম কাপুরকে চুমু না খেলেও দ্বিতীয় সিনেমা বচনা অ্যায় হাসিনো তে তিন আবেদনময়ী অভিনেত্রীকে চুমু খেয়েছেন তিনি। সিনেমায় তার প্রথম চুমু মিনিশা লাম্বার সঙ্গে। দ্বিতীয়টি লিফটের ভেতর বিপাশা বসুর সঙ্গে এবং তৃতীয়টি দীপিকা পাড়ুকোনের সঙ্গে। এরপর বলিউডের উঠতি অভিনেতাদের মধ্যে রণবীর সিং অন্যতম। কোনো কিছুতেই বাধা নেই এ অভিনেতার। তার প্রথম সিনেমা ব্যান্ড বাজা বারাত-এ অনুষ্কা শর্মার সঙ্গে তার চুমু বলিউডে অনেক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল বটে কিন্তু পরে তা ধোপে টেকেনি। তারপর আসি কমবয়সি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে সিদ্ধার্থ মালহোত্রা, আলিয়া ভাট এবং বরুন ধাওয়ানের অভিষেক হয় স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার সিনেমার মাধ্যমে। সিনেমাটিতে সিদ্ধার্থ-আলিয়াকে চুম্বন দৃশ্যে দেখা যায়। সিদ্ধার্থের পাশাপাশি এটি ছিল করণ জোহর পরিচালিত কোনো সিনেমায় প্রথম চুম্বন দৃশ্য।

এছাড়াও আজ শুরু হয়ে গেছে টলিউডের ছবিগুলোতেও, চলছে চুমু সগৌরবে। প্রত্যেকের দেখার ইচ্ছাও কম নয় তবুও নাক সিটকানো স্বভাব যায়নি এখনও। চলছে ছুরি, কাঁচি আর প্লাস্টিক সার্জারি; অবশ্যি সেটা ভারতীয় সেন্সরবোর্ডের। এবার সেদিকটা একটু দেখে নেওয়া যাক। আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস ছবিতে বাংলা আরবান সিনেমায় আধুনিক পোশাক আশাক কিংবা চুমু খাওয়া এসবে এগিয়ে রয়েছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। মৈনাক ভৌমিক পরিচালিত আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস চলচ্চিত্রে তিনি আর অনুব্রত একে অন্যকে জড়িয়ে যেভাবে সপাটে চুমু খেয়েছেন তাতে রীতিমতো শিহরিত হয়ে উঠেছিলেন দর্শক। এছাড়াও দত্ত ভার্সেস দত্ত, বিবর, বাস্তুশাপ, এবার শবর, আরশিনগর, নির্বাক, রাজকাহিনী, অপর্ণা সেন পরিচালিত পরমা থেকে শুরু করে আরও অনেক বাংলা কমার্শিয়াল ছবিতেও আজকে ঘনিষ্ট চুম্বনে সাবালকত্ব অর্জন করতে দেখা যাচ্ছে। রাজকাহিনীতে তো অসম্ভব চুম্বন দৃশ্য, সোহিনী সরকার ও সায়নী ঘোষের সমকামীতার চুম্বন দৃশ্য থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণা-আবীর আবার অভিনেত্রী জয়া হাসান ও রুদ্রনীলের চুম্বন ঘনিষ্টতা চোখে পড়ার মতো। মোদ্দা কথা এখনকার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাছে চুমু খানিকটা জলভাত। যে যাই বলুক এখনকার বিকিনি বা নাইন্টি পারসেন্ট ন্যুড অ্যাপিল যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন চুমুই কিন্তু সেক্সঅ্যাপিলের ফার্স্ট স্টেপ বলেই দাবী করেন বড় অংশের সিনেমাপ্রেমীরা।



Facebook Comments