স্ক্রিপ্টের মৌলিকত্ব আর অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফির জাদুতে দর্শককে মুগ্ধ করছে কলকাতার সত্যজিৎ দাস

অনেকে বলেন, এখন তো ডিএসএলআর হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেই সে ফোটোগ্রাফার। ক্যামেরাম্যান আর ফোটোগ্রাফারের একটা ফারাক যে আছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ চোখ ওভারলুক করে যায়। কেউ আবার বলেন হাজার একটা শর্ট ফিল্ম, হাজার একটা ফেস্টিভ্যাল, অ্যাওয়ার্ড না পেলে দেখে লাভ নেই। হ্যাঁ সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী অবশ্য স্বীকৃতি দাবী করে ঠিকই। কিন্তু অনেক ঈর্ষনীয় কাজ বাংলাতেও হচ্ছে। এমন অনেক কাজ হচ্ছে যার কাণ্ডারী কম বয়সের ছেলেমেয়েরা। আসলে শর্ট ফিল্ম তো এখন অনেকেই তৈরি করেন, তাই স্বীকৃতি না পেলে তাকেও খানিকটা ওই গোছের বক্তব্যই শুনতে হয়, যেমনটা একজন অ্যামেচার ফোটোগ্রাফারকে শুনতে হয়।

যা হোক সে অন্য প্রসঙ্গ, এমন একটি ছেলের কথা আজ লিখছি যার প্রতিভার এক ঝলক দেখলেই মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। নাম সত্যজিৎ দাস। সত্যজিৎ দাসের জন্ম কলকাতায়, ১৯৯৬ সালের ২ জুন। ছোটবেলা কেটেছে কলকাতাতেই। পড়েছেন কলকাতার একটি স্কুলে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের বিষয়ে স্নাতকোত্তর। সাথে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা দিল্লিতে। তখনই অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে প্রথম কাজ পান বড় ছবিতে।

তার প্রথম ছবিই কানস, বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়। পরবর্তী ছবি লন্ডন, আইএলও, এনএফডিসি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যায়। একই সময়ে আরও চারটে বড়ো ছবিতে পান অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার ডাক পান। এসব যখন চলছে, তখন শর্ট ফিল্ম দিয়ে নিজের পরিচালক হিসাবে নিজের জার্নি স্টার্ট করলেন সত্যজিৎ।

২০১৭ ডিসেম্বরে ‘ডেডলাইন’ শর্টফিল্মটির মাধ্যমে নিজের চলা শুরু করেছেন। শ্রদ্ধেয় পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ কে উৎসর্গ করে “ধর্ষন লিঙ্গ ভেদে হয় না , যে কেউ ধর্ষন হতে পারে” বিষয়বস্তর ওপর কাজটি দারুন প্রশংশা কুড়িয়েছে ও পুরস্কৃত হয়েছেন সত্যজিৎ। IPC 377 আইন পাশ করার আগেই সমতার অধিকার প্রতিষ্টার এই ছবি, সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।

এখন তাঁর একটি চলচ্চিত্র উৎসবে স্ক্রিনিং চলছে। ছবিটির নাম ‘দুই পৃথিবী’। এই ছবির গল্প একটি আবর্জনা পরিষ্কার করা একটি ছোট ছেলে আর তার মায়ের। ছেলেটির মা শারীরিকভাবে প্রতিবন্দী। দুর্গাপুজোর সময় ছেলেটি আবর্জনা ঘেটে রোজগার করে শ-দেড়েক টাকা। তারপর তার মায়ের জন্য শাড়ী আর মিষ্টি কিনে আনে। মায়ের অভিব্যক্তি এখানে ফুটে ওঠে চোখের জলে। দুই পৃথিবীতে অভিনয় করেছেন স্নেহা বিশ্বাস। যার অভিনয় তো ইতিমধ্যেই সারা বাংলায় প্রশংসিত। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘সহজ পাঠের গপ্পো’, ‘চোলাই’-এ অভিনয়ের দৌলতে দর্শকমহলে পরিচিত মুখ স্নেহা।

এতো গেল একটা ছবির প্রসঙ্গ, আরও একটি ছবি আসছে সত্যজিৎ-এর, ২০১৯-এ। এই ছবির গল্প এক চেন স্মোকার দেবমাল্য-র। একদিন রাস্তায় একটি বাচ্চাকে সে দেখে দেবমাল্যর অন্তরের অন্তঃস্থল কেঁপে  যায়। তারপর ছেলেটির দেখভাল করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সে। এবং সিদ্ধান্ত নেয় ধূমপানও ছেড়ে দেবে। দেবমাল্য ধূমপান ছেড়েছিল কি ছাড়েনি তা অবশ্য সিনেমা দেখার পরই জানা যাবে।

তবে মোটকথা সত্যজিতের কাজ মানুষ পছন্দ করছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে তার ছবি পুরষ্কৃত ও প্রশংসিত হচ্ছে। তার গল্প নির্বাচনের মৌলিকত্ব ও অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফি খানিকটা বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনই বলা চলে।



সত্যজিৎ দাস। ‘রায়’ নয়, তবে অনন্ত সম্ভাবনাময় সত্যজিতের কাজই আগামীতে বলে দেবে তিনি ‘রায়’-এর যোগ্য উত্তরসুরী কিনা।

Facebook Comments