আতঙ্ক নয়, সচেতন হতে হবে, বুদ্ধি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে…

-নিশো আল মামুন

প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক মহামারীর নাম হল-প্লেগ। গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইসের রচনা “হিস্ট্রি অব দ্যা পিলোপনেশিয়ান ওয়্যার” থেকে পাওয়া এই মহামারী গ্রামের পর গ্রাম জনমানবহীন করে দিয়েছিল। ৫৪০-৫৪১ খ্রিস্টাব্দের দিকে মিশরের এক ভয়ানক প্লেগের উৎপত্তি ঘটে।
এই মহামারী পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে যায়। রোগের প্রথম আক্রমণটা ছিল বাইজান্তাইন। প্লেগ ইউরোপের ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল।
দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন হিসেবে স্বীকৃত ১৩৩৪ সালের প্লেগ ছড়ায় চীন থেকে। এরপর ইতালি থেকে সমস্ত ইউরোপ।
২০২০ সালে পৃথিবীর দৃশ্যপট। নভেল করোনাভাইরাস কোভিড -১৯।
করোনাভাইরাস শব্দটি ল্যাটিন করোনা থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ মুকুট।

দ্বিমাত্রিক সঞ্চালন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটির ক্লাব আকৃতির প্রোটিন স্পাইকের কারনে দেখতে মুকুটের মত। মানবদেহে সৃষ্ট করোনাভাইরাস সংক্রামণ এড়ানোর মত ভ্যাক্সিন বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।  অর্থাৎ এই জ্ঞান মানুষ এখনো পরিপূর্ণ ভাবে ধরতে পারেনি।

 

মধ্য চীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। ৩১শে ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মত একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীন বিশ্ব সাস্থ সংস্থাকে সতর্ক করে।
এরপর ১১ই জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। সুত্র- বিবিসি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে – ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে কিছু কিছু গবেষকের মতে এর স্থায়ী ২৪ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। মানুষের মধ্যে যখন ভাইরাস উপসর্গ দেখা দিবে তখন বেশি মানুষকে সংক্রামণের সম্ভাবনা থাকবে। তবে নিজেরা অসুস্থ না থাকার সময়ও সুস্থ মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমিত করতে পারে।

এই ভাইরাস সারাবিশ্বে এরই মধ্যে ১৫০টির বেশি দেশে  ছড়িয়েছে। এখন আর আমাদের পিছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আতঙ্কিত বা ভয় না পেয়ে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে।বুদ্ধি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে।

এই সময়টি যেন ঠিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জুতা আবিষ্কারের মত।
“বলিতে পারি করিলে অনুমতি সহজে যাহে মানস হবে সিদ্ধ। নিজে দুটি চরণ ঢাকো তবে ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে”।

আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ। বসন্ত এবং গ্রীষ্মের সময়টাতে সবার একটু জ্বর সর্দি হয়ে থাকে। সেই সাথে কারো কারো গলা ব্যাথা। ভয় না পেয়ে ঘরের ভিতরে থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুসারে আবার কারো কারো ক্ষেত্রে আইইডিসিআর এ ফোন দিতে হবে। সময়টা আবার ডেঙ্গু জ্বরেরও। সবকিছু মাপকাঠি ঠিক রেখে আমাদের সতর্ক ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। একটু ভুলে সামান্য অসুখে যেন কারো জীবন দিতে না হয়।



দূর হতেই একে অপরের পাশে দাড়াতে হবে। যে সকল ঘর বাড়ি এর মধ্যেই লক ডাউন  করা তাদের প্রতি অতি যত্নবান হতে হবে। মনে রাখতে হবে তাদের কাছে শিশু সন্তান ও বৃদ্ধও আছে।

শুধু নিজে সুখে থাকলেই পৃথিবী সুখের হয়না। চারপাশ সুখে থাকলেই কেবল প্রকৃত সুখ পাওয়া সম্ভব। আজকের পৃথিবী তাই সাক্ষি দিচ্ছে।
মনবল যথেষ্ট শক্ত রাখতে হবে। মনবল (Mind Power)

ভেঙ্গে গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এতে বিপদ আরও বেড়ে যায়। যে কোন ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে প্রথমে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে। তাই সব সময় টেনশন মুক্ত থাকতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সে সব খাবার খেতে হবে।
নিজেকে নিজেই ভালো কিছু পরামর্শ দিতে হবে।

এই পরামর্শ দিয়ে লাভ কী?

আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষক, মাইন্ড ট্রেনার সৈয়দ হারুন এর লেখা, দি মাইন্ড ট্রেনিং সিস্টেম বই থেকে একটা উদাহরণ দেই-

জাপানী বিজ্ঞানীর নাম ডঃ মাসারু ইমতো। তিনি একটি পাত্রে জল নিলেন। তারপর সেই জলের সামনে পারথনা  করলেন। জলের পাত্রটি তিন ঘণ্টা ফ্রিজে ঠাণ্ডা করলেন। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে ছবি তুললেন। সাধারণ জলের ক্রিস্টাল ফর্মেশন অবিন্যস্ত ও বিশৃঙ্খল থাকে। এই ছবিতে জলের ক্রিস্টাল ফর্মেশন ছিল সুন্দর। ছিল ভিন্ন রকমের শৃঙ্খল। ডঃ ইমতো আরও একটি পরীক্ষা করলেন – দুটি পাত্রে জল নিয়ে, দুটি কাগজ নিলেন। একটিতে লিখলেন “তুমি আমাকে অসুস্থ করে ফেল, আমি তোমাকে খুন করব”। অন্য কাগজে লিখলেন “ তোমাকে ভালোবাসি”। তারপর দুই পাত্রে দুটি কাগজ লাগিয়ে দিলেন। কথাগুলো জলের সামনে উচ্চারণও করলেন। কয়েকদিন অপেক্ষা করার পর দুই পাত্রের জল আণুবীক্ষণিক ছবি তুলে দেখলেন অদ্ভুত ঘটনা। যে পাত্রের গায়ে লেখা ছিল “তুমি আমাকে অসুস্থ করে ফেল, আমি তোমাকে খুন করে ফেলব” সে পাত্রের জলের ক্রিস্টাল ফর্মেশন ছিল ভয়ঙ্কর। আর যে পাত্রকে বলেছিল “ তোমাকে ভালবাসি” সেই পাত্রের জলের ক্রিস্টাল ফর্মেশন ছিল এত সুন্দর তা বিস্ময় জাগানো ঘটনাই বলা  যেতে পারে। যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী তারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে জল পান করার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে পান করতে বলা হয়।

আমাদের শরীরের শতকরা ৭২ ভাগই জল। ভেবে দেখুন আপনার কথা বা চিন্তা আপনার শরীরে কি ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে। প্রখ্যাত ফরাসী গবেষক ও মনস্তবিদ ইমিলি কুয়ে (১৮৫৭-১৯২৬) প্রমাণ করেছিলেন, রোগীর অবচেতন মনে সাজেশন দেওয়ার মাধ্যমে খুব দ্রুত সুস্থ করা যায়।

ডঃ লিপটন দীর্ঘ দিনের গবেষণায় প্রমান করেছেন  মানবদেহে ৫০ থেকে ৭০ ট্রিলিয়ন সেল বা কোষ রয়েছে। প্রতিটি সেল বা কোষই একেটি আণুবীক্ষণিক মানব সত্তা। সেখানে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের সকল বৈশিষ্ট্য বিরাজমান। এই সেল বা কোষ থেকেই কিন্ত জন্ম নেয় আরেকটি মানুষ। দেহের এই লক্ষ কোটি কোষ আপনার কমান্ড শুনতে পারে এবং তা পালনও করে। তিনি প্রমাণ করেছেন-কোন একটি বেয়াদব সেল বা কোষ আপনার কমান্ড না শুনলে অন্য সেল বা কোষগুলি একত্রিত হয়ে সেই বেয়াদব সেল বা কোষকে শরীর থেকে বিদায় করে দেয় বা মেরে ফেলে। তাই ‘বেটার’ কমান্ডের মাধ্যমে জীবনটাকে ভালোর চেয়েও ভালো রাখা সম্ভব।

সব শেষে বলব, প্রতিরোধটা নিজের পরিবার থেকেই করতে হবে। একটি পরিবার সুস্থ থাকলে একটি গুষ্টি সুস্থ থাকবে। একটি গুষ্টি সুস্থ থাকলে একটি গ্রাম। আর এই ভাবেই আমাদের সমস্ত পৃথিবী। 

আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে- আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর একটা পৃথিবী রেখে যেতে চাই।

Facebook Comments