মুগ্ধতার অন্য নাম কসবা অর্ঘ্য’র ‘উরুভঙ্গম’

শুভঙ্কর দেবরায়

অ্যাকাডেমি চত্বর, রাত্রি ১১টা এত লোকের জমায়েত কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধিৎসু যে কয়েকজন সেদিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন তাদের অনেকেই পরদিন সকালে বলেছেন এমন রাত্রি জীবনে কয়েকটাই আসে। হ্যাঁ মনীশ মিত্র নির্দেশিত ‘উরুভঙ্গম’ এমনই একটা নাটক যেখানে মুগ্ধতাই শেষ কথা। নাটক শুরু হয়েছিল রাত ১১টায়। এগারোটা মানে এগারোটাই নির্দেশক এতটাই পানচুয়াল। আর শেষ ভোর পাঁচটায়। আমার ব্যক্তিগত অভিমত এই ছ’ঘণ্টা যেকোনো মানুষের জীবনের স্মরনীয় ছ’ঘন্টা হতে পারে। সম্পূর্ণ মহাভারতকে বিভিন্ন আঙ্গিকে অভিনয় ও সঙ্গীতের মাধ্যমে এই ছ’ঘন্টায় মানুষের কাছে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা অনবদ্য। নাটকটিতে ব্যবহৃত সঙ্গীত মনোমুগ্ধকর। অনেক বিশিষ্ট সমালোচকরাই একথা স্বীকার করেছেন এই নাটকে যে সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে তা ভারতীয় থিয়েটারকে পঞ্চাশ বছর এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই নাটকটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল, অভিনয়টা পুরোটাই পেক্ষাগৃহের ভেতরে উপস্থাপন না করে দর্শককে চারটি ইন্টারভ্যালে বাইরে নিয়ে গিয়ে সেখানে লিঙ্কেজ ধরে রেখে অনবদ্য সঙ্গীত পরিবেশনা আর কিছু ন্যাচারাল অ্যাক্টিং-এর মাধ্যমে সেই মহাভারতের সাথে সম্পৃক্ত বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো। সঙ্গীত এই নাটকের প্রান। এই নাটকে ব্যবহৃত সঙ্গীত মন ও মননের সাথে এতটাই সম্পৃক্ত হয়ে যায় যে নাটক, সঙ্গীত আর ধারাভাষ্য মিলে দর্শক এই ছ’ঘন্টা একটা ঘোরের থাকতে বাধ্য।

কসবা অর্ঘ্য’র উপস্থাপনা ‘উরুভঙ্গম’ ৬ ঘণ্টার মোহময় প্রাণোচ্ছল যে আবহাওয়া তারা তৈরি করেছিল, যেন মনে হচ্ছিল কলাকুশলীরা হ্যামলিনের বাঁশিয়ালা আর দর্শক হিপনটাইজড। এই নাটকটি দেখার পর অনেক দর্শককেই বলেছেন তারা আপ্লুত এবং গর্বিতও, যে এমন একটি কাজ এই শহরে হয়। সারা নাটক জুড়ে মহাভারতের সূত্র ধরে আজকের রাজনীতি, নারীর অবস্থান, সময়ের রঙে জীবনের প্রাসঙ্গিকতা বার বার একটা জিনিস দর্শককে ভাবাবে, আমরা ভালো আছি তো?

রাত ভোরের দিকে এগোচ্ছে আর আকাশের রঙ বদলানোর সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে মহাভারতের অধ্যায়। চারটি ইন্টারভ্যালে কসবা অর্ঘ্য যে অভূতপূর্ব উপস্থাপনা আমাদের সামনে তুলে ধরেছিল, ভাবলে গায়ের রোম এখনও খাঁড়া হয়ে যায়। বিশেষত মেরি আচার্যের উপস্থাপনা এতে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। নাটকের ইন্টারভালে একটু জোরালো কণ্ঠে মহাভারতের দ্রৌপদী থেকে আজকের নারী নির্যাতন প্রসঙ্গে নির্দেশক যে প্রশ্নটা বারবার তুলে ধরেছেন দর্শকের কাছে সেই প্রশ্ন- ‘সেফটি অফ সাইলেন্স’, মনের ভেতর যে দ্বিধান্বিত আলোড়নের ঝড় উঠিয়েছিল তা সহজে থামবার নয়। শব্দটা বারবার কানে বাজছিল – ‘safety of silence’। সত্যিই তো নিজেদের সেফটির কথা ভেবে মানব প্রজাতি চরমতম অন্যায়ও হজম করে নেয় নির্দ্বিধায়। জয়দীপ সহ তার যন্ত্রানুসঙ্গীদের পারফরমেন্স যতই বলা হবে ততই কম হয়ে যাবে। সব শেষে বলি রাজু বেরা, তাপস চ্যাটার্জী, সীমা ঘোষ সহ স্বয়ং মনীশবাবুর মনোমুগ্ধকর অভিনয়ের কথা তো বলেই দিল হল ভর্তি অগনিত দর্শক। হাততালির প্রতিধ্বনিই বলে দিচ্ছিল – উরুভঙ্গম, আবার দেখা হবে।

Facebook Comments