মন কাড়লো মালদা আগামীর নাটক ‘রাজন’

পালক মিডিয়া ডেস্ক, মালদা: শুধু কলকাতাই নয় মফঃস্বলের ছোট দলগুলোও পিছিয়ে নেই সুচারু নাটকের উপস্থাপনায়। এমনি একটা দল মালদা আগামী। তিনমাস বয়সের দলটি দু’টি নাটক মঞ্চস্থ করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। তাদের তৃতীয় প্রযোজনা ‘রাজন’। আসলে এই নাটকটি দেখতে দেখতে কোথাও মনে হয়নি যে নতুন কোনো দলের নাটক দেখছি। মালদা শহরেই মঞ্চস্থ হওয়া মালদা আগামী নাট্যগোষ্ঠীর রাজন নাটকের সাব্জেক্ট সম্পূর্ণ ইউনিক বলব না। সমকামিতা নিয়েও আগেও অনেক কাজ হয়েছে। তবে তাদের উপস্থাপনা ও নাট্যকার জয়ন্ত বিশ্বাসের অসম্ভব সুন্দর কাহিনির বুনন দর্শকের মন জয় করে ফেলতে পারে নিমেষে।

আবারও একটা কথা বলতে হয়, জয়ন্ত বিশ্বাস ও কুনাল সরকারের যৌথ নির্দেশনায় ‘রাজন’ নাটকটি দেখে অবচেতনেও বলা সম্ভব নয় মালদা আগামী একটি নতুন নাট্যদল। নাটকের মূল চরিত্র পাঁচটি হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজনের বিচারসভা ঘিরেই কাহিনি বিস্তার লাভ করে। সমকামিতা নাটকের মূল বিষয় এবং নাটকটি রূপকধর্মী। বর্তমান সমাজব্যবস্থার, আইন-প্রনয়নের একটা রূপরেখা আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। সমগ্র নাটকটিই একটি রূপকতার আড়ালে পরিবেশিত হয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন- রাজন, প্রধান সেনাপতি, কিউপিড (গ্রীক প্রেমের দেবতা), পুরুষ ও সমগ্র প্রকৃতির স্বরূপ হিসাবে এক নারী। গল্প অনুসারে প্রেমের দেবতা কিউপিড, যার নিক্ষেপিত স্বর্ণালী বানে প্রেমের উদ্রেক হয় মানুষের ভেতর আর রূপালী বান মানুষকে প্রেম বিমুখ করে। নাটকে রাজার বিচার সভায় ধরে আনা পুরুষটি কিউপিডের নিক্ষেপিত বানে কামাসক্ত হয়ে পড়ে তাও তারই প্রতি। কিউপিডও পুরুষ এবং সেও পুরুষ। সমকামীতা সৃষ্টির পরিচায়ক নয় এমনটাই নিয়ম। তাই পুরুষটিকে এবং তার সাথে নারীরূপী প্রকৃতিকে নিয়ে আসা হয় বিচারসভায়, সমকামিতার অপরাধে। প্রধান সেনাপতির কথায় অভিযুক্ত হন প্রেমের দেবতা ইউপিডও। শাস্তির আদেশ দেন রাজা। এই ঘটনাপ্রবাহকে আপাত সাধারন মনে হলেও এর নাটক দেখে ফিরেও এর রেশ কাটতে সময় লেগেছে। এমন কিছু সংলাপ আছে যা সত্যিই সমাজ-ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাড় করায়। ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজস্বতা আরও এমন কিছু শব্ধ আভিধানিক হয়েই থেকে গেল না তো! নাটকটা যেখানে শেষ হচ্ছে সে এক অদ্ভুত টানা-পোড়েনের ইতিবৃত্ত। রাজন দেশের প্রধান। কাউকে শাস্তি দিয়ে তিনি শান্তিতে থাকতে পারেন না। তাঁর প্রতিনিয়ত মনে হতে থাকে কারোর কোনও সমস্যা, অভাব, অভিযোগ জানানোর জন্য রাজন আছেন, কিন্তু রাজন কার কাছে অভিযোগ জানাবে! নাটকের শেষ দৃশ্যে অনেক কথা বলতে চেয়েছেন নির্দেশক। ক্ষমতা আসলে কোথাও না কোথাও গিয়ে অসহায়তাও। শেষ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে রাজন যে চেয়ারটিতে বসে ছিলেন সেটি কাঁটার চেয়ার। ক্ষমতা তো এমনই। সমাজের বিভিন্ন আঙ্গিকগুলো যেভাবে ফুটে উঠেছে সমগ্র নাটক জুড়ে তা অনবদ্য।

রাজনের চরিত্রে কুনাল সরকারের অভিনয় ভালো লেগেছে। আপাত খলচরিত্র প্রধান সেনাপতির চরিত্রে অমলেশ দাশের অভিনয় মন কেড়েছে। অন্যান্য কলাকুশলীরাও দর্শকের মননে গভীর অভিঘাত রেখেছে। গ্রীক প্রেমের দেবতা কিউপিড থেকে দেশজ স্বত্বঃ, রজঃ ও তম গুনের উল্লেখে নাটকটিতে গ্রীক মাইথোলজি ও ভারতীয় দেহতত্ত্বের মেলবন্ধন বিশেষভাবে চোখে পড়ার মত। সাহসী বিষয়বস্তু, সাহসী উপস্থাপনা ও কোরিওগ্রাফির পাশাপাশি বিশেষভাবে চোখে পড়ে ইমন পালের সাহসী পোশাক পরিকল্পনা।

Facebook Comments