আজও পারভিন ববি এক রহস্যময়তা

সোহিনী দত্ত

ববি বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে কত তারকা এসেছেন, চলে গেছেন, কতজন হারিয়েও গেছেন কতভাবে। কারোর কথা লোকে মনে রেখেছে, কাউকে মনে রাখেনি। কত অদ্ভুত গল্পের জন্ম দিয়েছেন বলিউডের এক একজন তারকা। পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন সিনেমার বাইরের নানা কারণে। লোকজন গালগল্প করেছে সেসব নিয়ে। চায়ের কাপে উঠেছে ঝড়। কলেজের উঠতি তরুণ-তরুণীদের গবেষণার বিষয়বস্তু হয়তো ছিল প্রিয় বা অপ্রিয় তারকার কাণ্ড-কারখানা। তবে হলফ করে বলা যায়, পারভিন ববিকে নিয়ে যা গবেষণা লোকে করেছে,  হয়ত  এমনটা বোধহয় বলিউডের আর কোনও তারকাকে নিয়ে হয়নি। আশির দশকে যারা হিন্দি সিনেমার ভক্ত ছিলেন, তাদের কাঁপন তোলা একটা নাম পারভিন ববি।

জুনাগড় নামের শহরের মতো একটা জায়গায় এক মুসলমান পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। বাড়িতে পড়াশোনার কড়াকড়ি থাকা সত্বেও পারভিন নিজে ইংরেজীতে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই খানিকটা ওয়েস্টার্ন ধাঁচের ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করতেন পারভিন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় তারাও সেভাবে বাধা দিতেন না। মিডিয়ায় কেরিয়ার গড়ার ব্যাপারে কিশোরী বয়স থেকেই আগ্রহী ছিলেন পারভিন। দেখতে সুন্দরী, দারুণ ফিগার, বেশ লম্বা- সব মিলিয়ে বলিউডের জন্যে পারফেক্ট প্যাকেজই ছিলেন তিনি। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের সুন্দরী প্রতিযোগীতায় মাঝেমধ্যেই নিজের ছবি পাঠাতেন। গুজরাটের পত্রিকায় হুটহাট দেখা মিলতো তার। এভাবেই একবার বোম্বের একটা ম্যাগাজিন থেকে ডাক এলো ফটোসেশনের। ১৯৭২ সালের কথা, পারভিনের বয়স তখন তেইশ বছর। প্রফেশনাল মডেলিং-এর শুরুটা সেবছরই। তার আবেদনময়ী চেহারা বলিউডের লোকজনের নজরে আসতে দেরী হলো না। তাঁর বলিউডে অভিষেক ক্রিকেটার সেলিম দুররানীর বিপরীতে “চরিত্র” নামের সিনেমা দিয়ে। ব্যবসায়িকভাবে ফ্লপ হয়েছিল সিনেমাটা, তবে দাগ কেটে রেখে গিয়েছিলেন পারভিন।

বলিউডে পারভিনের কেরিয়ার বেশীদিনের নয়, ক্যালেন্ডারের পাতায় হিসেব করলে সংখ্যাটা এগারো বছরের। অভিনয় করেছিলেন মোট সাতান্নটা সিনেমায়। এরমধ্যে দারুণ কিছু কাজ রয়েছে। মজবুর, সুহাগ, কালা পাত্থার, নমক হালাল, অমর আকবর অ্যান্থনি, দিওয়ারের মতো সিনেমায় দেখা গেছে তাঁকে। সমসাময়িক নায়িকাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন; হেমা মালিনী, রেখা, শাবানা আজমী, জিনাত আমান, জয়া ভাদুড়ি বা রীনা রায়দের সঙ্গে একই কাতারে উচ্চারিত হতো তার নাম। তবে একটা জায়গায় বাকী সবাইকেই পেছনে ফেলেছিলেন তিনি বিশাল ব্যবধানে, সেটা হল ফ্যাশনে। তার ড্রেস সেন্স ছিল অসাধারণ, সেটা এখনকার ফ্যাশন স্পেশালিস্টরাও স্বীকার করেন। জিনাত আমানকে সেক্স সিম্বল ডাকা হতো সেই সময়ে কিন্ত লোকে বলতো, পারভিন ববি বোরখা পরে সামনে এলেও নাকি উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে!

সিনেমায় সাহসী পোষাকের প্রচলনটা পারভিন ববি আর জিনাত আমানের হাত ধরেই হয়েছিল। পারভিন কখনও বিয়ে করেননি। লাভ লাইফ ব্যপারটাও ভালো ছিল না তার জন্যে, বেশ কবার প্রেমে পড়েছেন, সম্পর্কে জড়িয়েছেন, কিন্তু টেকেনি একটাও। পরিচালক মহেশ ভাটের সঙ্গে তাঁর প্রেমের কাহিনী বলিউডের মুখরোচক গসিপে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু বেশীদিন টেকেনি সেটা, পারভিনের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে পেয়ে মহেশ সরে আসেন। একটা সময়ে ফিরে যান তার নিজের স্ত্রীর কাছেই। এর আগে পারভিন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন সহ-অভিনেতা কবির বেদী আর ড্যানি ড্যাংজপার সঙ্গে।

১৯৭৯ সালের এক রাতে আচমকাই পারভিনের ফ্ল্যাটে অস্বাভাবিক একটা দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছিলেন মহেশ ভাট। ফ্ল্যাটের চাবি ছিল তাঁর কাছে, ঢুকেই তিনি অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখলেন না। হাতড়ে সুইচবোর্ড খুঁজে বের করলেন, লাইট জ্বলে উঠতেই চমকে উঠলেন। ছুরি হাতে বেডরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পারভিন ববি, মহেশকে দেখে খানিকটা আশ্বস্ত হলেন যেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘ওরা সবাই আমাকে মেরে ফেলার জন্যে খুঁজছে।’ ওরা কারা, সেই প্রশ্নের জবাব অবশ্য পাননি মহেশ।

পারভিন যখন মিডিয়ায় কাজ শুরু করেছেন, তখন উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর নাম দিয়ে তার কাছে চিঠি পাঠানো হতো। একটা মুসলমান মেয়ে সিনেমায় অভিনয় করছে, আবেদনময়ী হিসেবে পুরো ভারত তাঁকে জানছে এটা হয়তো কট্টরপন্থী কেউ কেউ মেনে নিতে পারেনি। সেসব গল্প পারভিনের কাছে শুনেছিলেন মহেশ।

সে রাতের সেই আচমকা দৃশ্যটা আসলে বড়সড় একটা অঘটনের শুরু ছিল। এরপর থেকে নিয়মিতই ব্যপারগুলো ঘটতে শুরু করলো। কোন একটা ব্যপারে ভীষণ ভয়ে থাকতেন, কে বা কারা যেন তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে, তার পেছনে লেগে আছে বলে বারবার দাবী করতেন পারভিন। কিন্ত বিশ্বাসযোগ্য কিছু বলতে পারতেন না আবার আশেপাশের মানুষজনকে ঠিকঠাক বোঝাতে না পেরে রেগেও যেতেন। একটা সময়ে এমন অবস্থা হলো, ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিলেন। সিনেমায় তিনি চুক্তিবদ্ধ, নিয়ম করে শুটিং-এ যেতে হয়! তার জন্যে সিনেমার শুটিং থেমে থাকে, শিডিউল ফাঁসানোর অভিযোগ আসতে থাকে তাঁর বিরুদ্ধে। মহেশ তাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন, রোগ ধরা পড়লো না, সবটাই হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিলেন চিকিৎসক।



এরপর ডাক্তারি পরীক্ষায় ধরা পড়লো, প্যারানয়ে স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত পারভিন। একারণেই নিজের চারপাশের সবাইকে শত্রু ভাবেন তিনি। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো, সবার এক কথা- ইলেকট্রিক শক ছাড়া এই রোগের চিকিৎসা নেই। মহেশ ভাট রাজী হলেন না এই প্রস্তাবে। পারভিনের সাবেক দুই প্রেমিক কবির বেদি আর ড্যানি ড্যাংজ্যাঙ্গপাও ওদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। মহেশকে পরামর্শ দিলেন, পারভিনকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে।

অবস্থার আরও অবনতি হতে লাগলো দিনে দিনে। পারভিনকে খাওয়া দাওয়া করানোও মুশকিল হয়ে পড়লো, তার শুধু মনে হতো, কেউ খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে রেখেছে! একারণে পারভিনের প্লেটের খাবার প্রথমে মহেশকে একটু খেয়ে দেখাতে হতো। অনেক কষ্টে তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, ঔষধে কোন বিষ নেই।

এরপর একসময় মহেশ ভাটকে ডাক্তার পরামর্শ দিলেন কিছুদিন পারভিনের থেকে দূরে থাকতে। কারণ তিনি তাকেও শত্রু ভাবতে লেগেছেন। এরপর আবার মেলামেশার কিছুদিনের মধ্যেই সম্পর্ক চুকেবুকে যায় তাদের। এর পরে পারভিন ১৯৮৩ সালে ভারত ছাড়লেন। কয়েকটা দেশ ঘুরলেন আধ্যাত্নিক শান্তির আশায়, পরে থিতু হলেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে পাঁচ বছর ছিলেন। তবে ঝঞ্ঝাটবিহীনভাবে ছিলেন, এটা বলা যাবে না মোটেও। জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে একবার প্রযোজনীয় ডকুমেন্ট ছাড়া বিমানে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল তাঁর, অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনে তাকে পাঠানো হয়েছিল মানসিক রোগীদের হাসপাতালে। সেখানকার জেনারেল ওয়ার্ডে আরও ত্রিশজন রোগীর সঙ্গে রাখা হয়েছিল তাঁকে। কয়েকদিন সেখানে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। খবর পেয়ে আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নিজে এসে দেখা করেছিলেন তাঁর সঙ্গে, পারভিনের ছাড়া পাবার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনিই। ১৯৮৯ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। এরমধ্যেও তার অভিনীত সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, যেগুলোর শুটিং হয়তো আগে করে গিয়েছিলেন তিনি।

ভারতে যখন তিনি পা রাখলেন, পারভিনকে তখন চেনা যায় না। মোটা হয়ে গেছেন অনেকটা, সেই কমনীয়তা বিলীন হয়ে গেছে কোথায় যেন! তার আসার খবর পেয়ে সাংবাদিকেরা সাক্ষাত্কার নিতে ছুটে এলেন তার ফ্ল্যাটে। সেসব সাক্ষাত্কারে একেকটা বোমা ফাটালেন তিনি। সত্যি-মিথ্যা যাচাই করার সময় নেই, খবরের কাগজে শুধু শিরোনাম হচ্ছে- আজ পারভিন বলছেন, অমিতাভ বচ্চন তাকে খুনের চেষ্টা করেছেন, কাল বলছেন, অমিতাভ বচ্চন নাকি আন্ডারওযার্ল্ডের বিশাল মাফিয়া ডন, কিছুদিন বাদে বলছেন, ১৯৯৩ সালের বোমা হামলার সঙ্গে সঞ্জয় দত্ত জড়িত, তাঁর কাছে প্রমাণ আছে!

স্কিজোফ্রেনিয়ার সমস্যা তাঁর যায়নি, সবাইকে তখনও সন্দেহ করতেন। সাংবাদিকেরা সাক্ষাৎকার নিতে এলে একটা রেকর্ডারে তিনিই উল্টো তাঁদের কথাবার্তা রেকর্ড করে রাখতেন। তাকে নিয়ে উল্টোপাল্টা কিছু লেখা হয়েছে শুনলেই সেই পত্রিকা আর সাংবাদিকদের অমিতাভ বচ্চনের এজেন্ট নাম দিয়ে দিতেন তিনি। বিগ-বির ওপরে তার এত ক্ষোভের কারণটা কি ছিল কে জানে! অমিতাভের সঙ্গে তিনি আটটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, ব্যবসায়িকভাবে সবগুলোই ছিল দারুণ সফল। সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে দু’জনের প্রেম হয়েছিল বলে গুজব আছে, তবে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনকূলে আপন বলতে তেমন কেউ ছিল না তার, বাবার দিকের আত্নীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, কাউকে চিনতেনও না। আর তিনি সিনেমায় নাম লেখানোর পরেই আত্মীয়রা ভুলে গিয়েছিলেন যে পারভিন নামে তাদের কোন ভাগ্নী আছে!

জীবনটা তার এভাবেই কেটেছে। কিছু মানুষ তাকে ঘৃণা করেছে, তার কথাবার্তা বা কর্মকাণ্ডে কেউ হেসেছে, কেউবা করুণার দৃষ্টিতে দেখেছে। মৃত্যুতেও তিনি কারো ভালোবাসা পাননি, সেই মৃত্যুটাও ছিল কি রহস্যময়! কত অবহেলা জড়িয়ে ছিল সেই মৃত্যুর সঙ্গে। ২০০৫ সালের বাইশে জানুযারী নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। তিনটে দিন তাঁর লাশ পড়েছিল নিজের ফ্ল্যাটে, কেউ খবর নিতে আসেনি। দরজার সামনে তিনদিনের দুধের প্যাকেট, খবরের কাগজ এসব জমে থাকায় সন্দেহ হয়েছিল প্রতিবেশীদের। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করেছিল তাঁর গলে যাওয়া মৃতদেহ। পায়ে ছিল ব্যান্ডেজ বাঁধা, পাশেই একটা হুইলচেয়ার। সম্ভবত সেটা থেকেই পড়ে গিয়েছিলেন পারভিন।

হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন ডাক্তারেরা। পাকস্থলীতে মদ ছাড়া অন্যকিছু পাওয়া যায়নি। সন্দেহবাতিকগ্রস্থ হওয়ায় ঘরে একটা কাজের লোকও রাখতেন না তিনি। জীবিত পারভিন ববিকে একটা সময় পরে সবাই এড়িয়ে চলেছে, মৃত্যুর  পরেও তেমন কেউই আসেনি তাঁর দেহের সৎকার করতে। আমেরিকায় গিয়ে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। তবে তার শেষকৃত্য করা হয়েছিল মুসলিম রীতিতেই।

পারভিন মারা যাওযার পরের বছরে মহেষ ভাট ‘ওহ লামহে’ নামের একটা সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন, সেটা ছিল পারভিনের সেমিবায়োগ্রাফিক ফিল্ম। তবে একজন অভিনেত্রী কী পেল ইন্ডাস্ট্রি থেকে! এতগুলো বছর ধরে অনেক অবমাননা, লাঞ্ছনা আর রহস্যময়তা তাঁর জীবনের পরতে পরতে। আজও পারভিন ববি এক রহস্যময়তারই নাম।

Facebook Comments