সুমনের ‘তোমাকে চাই’ শুধু গান নয়, একটা মাইলস্টোন

সৈকত ঘোষ

কি চলছে সেটা বড়ো কথা নয়…কিছু কিছু মানুষ থাকেন যারা ট্রেন্ড তৈরি করতে ভালোবাসেন। কবির সুমন এরকমই একজন। তার গান নয়ের দশকে বাংলা গানে নিয়ে এলো একেবারে নতুন একটা ফ্লেভার যা বাঙালি এর আগে কখনো দেখেনি রাদার শোনেনি। এককথায় ‘তোমাকে চাই’ হয়ে উঠলো নতুনতর বাংলা গানের মাইলস্টোন। চলমান ধারাকে ভেঙে সুমন তৈরি করলেন বাংলা গানের নতুন এক ডায়মেনশন। সালটা ১৯৯২। গিটার হাতে একা একজন বাঙালি স্টেজ কাঁপিয়ে দরাজ গলায় যখন গেয়ে উঠলেন “তোমাকে চাই”- শুধু কলকাতা নয় গোটা পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা পৃথিবীর বাঙালি বিস্মিত হলো, মুগ্ধ হলো। এ যেন একটা পাথ চেঞ্জিং এক্সপিরিয়েন্স। তারাও সুমনের সাথে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠলো তোমাকে চাই। কি সহজ অথচ কি গভীর সে উচ্চারণ। এ গান হয়ে উঠলো মানুষের গান। গানের কথার সাথে শ্রোতারা অদ্ভুতভাবে নিজেদের রিলেট করতে পারলো। আর এখানেই সবকিছু ছাপিয়ে গানটি হয়ে উঠলো সার্বজনীন। আর তাই এখনও হটাৎ তোমাকে চাই শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়…

আমরা সবাই জানি প্রত্যেকটা শুরুর পেছনে থাকে একটা দীর্ঘ ইতিহাস। থাকে এক বিস্তৃত যাপন। জার্নিটা হয়তো নয়ের দশকের আগেই শুরু হয়ে গেছিলো গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। কিন্তু সুমন সেই ধারাটিকে এক আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। এর আগে কোনো নতুন বাংলা গান এতটা মাইলেজ পেয়েছে বলে মনে হয় না। এইচ এমভি থেকে বারোটি গান নিয়ে ১৯৯২-সালে রিলিজ করে সুমনের প্রথম অ্যালবাম “তোমাকে চাই” আর শুরুতেই বাজিমাত। হয়তো একেই বলে ট্যালেন্ট। আসলে বড়ো মানুষদের শুরুটা সবসময় এরকমই ধামকাদার হয় ঠিক যেমন লর্ডসে সেঞ্চুরি দিয়ে সৌরভের টেস্ট অভিষেক। পরিসংখ্যান বলছে শুধু সেই বছর নয় গোটা নব্বইতে সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যালবাম “তোমাকে চাই”। একটা গান যে একটা সময়কে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে হয়ে উঠতে পারে ফেনোমেনাল, সুমন সেটা প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিলেন। আর তারপর বাকিটা ইতিহাস। সেই সময়ের তরুণ প্রজন্ম এই গানগুলোকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নিলো। হু হু করে হট কেকের মতো বিক্রি হতে থাকলো ক্যাসেট। মানুষ ভাবতে শুরু করলো তাহলে এভাবেও ভাবা যায়, এভাবেও একটা গান তৈরি হতে পারে।

হয়তো পুরোটা প্ল্যান করে বা সেই অর্থে ভেবে চিন্তে করা হয়নি। সৃষ্টির আনন্দে ভালোবাসা থেকেই কাজটা করেছিলেন সুমন। এর আগে এই ধরণের গানের কথা বা গানের মিউজিক arrangement অন্তত বাংলায় ভাবা যেত না। সুমনের উত্তরসূরি হিসাবে এই জনারে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু এটাও ঠিক তার সময়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায় জনপ্রিয়তা পাননি বরং ‘তোমাকে চাই’ আসার পর শ্রোতারা ‘মহিনের ঘোড়াগুলি’ শুনতে শুরু করেন সেইদিক থেকে দেখলে সুমনই প্রথম বাঙালির মিউজিক টেস্ট বদলে দিয়েছিলেন। রচনা করেছিলেন আজকের বাংলা বেসিক এমনকি অন্যধারার সিনেমার গানের ভিত্তিপ্রস্তর। সাউন্ড স্কেপিং থেকে শুরু করে রেকর্ডিং এমনকি প্রেজেন্টেশন কভার ডিজাইন সব ডিপার্টমেন্টেই ছিল নতুনত্বের ছোঁয়া। বাঙালি গায়করাও যে ধুতি পাঞ্জাবী ছেড়ে জিন্স টি-শার্ট পরে রীতিমতো স্টেজ কাঁপাতে পারে তা প্রথম করে দেখান কবীর সুমন তার ‘তোমাকে চাই’ গানটির মধ্যে দিয়ে। গানের কথার মধ্যে উঠে আসে সেই সময়, অস্থিরতা, প্রেম, যৌনতা, প্রতিবাদ, রাজনীতি সবকিছু। তাই প্রকৃত অর্থেই এই গানটি শুধুমাত্র গান নয় একটা সময়ের আয়না…

Facebook Comments