‘ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস…’ গানটা শিলাজিৎ-এর মাথায় এল কীভাবে?

“ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস/ এই মেঘলা দুপুরে কত কাছাকাছি থাকতাম…ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস/ ঝরে পরতিস টিপ টুপ টিপ টুপটাপ গায়ে মাখতাম…” এই লিরিক্স এই সুর আদতে এক অন্য অনুভব। এই গান এখনও ইয়াং জেনারেশনের হার্টথ্রব সং। খরখরে রোদে বা হাঁসফাঁস হৃদয়ে এমন গানের দু-এক টুকরোই মনে আনতে পারে শান্তি বারিশ। y2k – এর শুরুতে রিলিজ করা এই গান যেন প্রত্যেকটা প্রেমিক সত্বার মনের কথা। প্রত্যেক প্রেমিকের অন্তরের হিডেন কুঠুরির অভিব্যাক্তি। প্রত্যেকটা ছেলের বুকের ভেতরে স্পর্শকাতর একটা নামই হয়তো ঝিন্টি। এই গানটা হঠাৎ করে শিলাজিৎ-এর মাথায় কী করে এল? এমন একটা অনুভূতি, এমন একটা ঘোরলাগা আবেগ। এ প্রসঙ্গে শিলাজিৎ বলেন, “ঝিন্টি গানটা এসেছে হঠাৎ করেই একদিন দুপুরবেলা। আমার বাড়িতে সেদিন কেউ ছিল না। একটা ফোন এসেছিল। এক মহিলা ফোন করেছিলেন। নানারকম কথাবার্তা আলোচনা হচ্ছিল। সেদিন খুব মেঘলাও করেছিল। কথা প্রসঙ্গে সে বলল এত দূরে থাকি এখান থেকে কী করে যাবো? আমি বললাম তুই বৃষ্টি হতে পারতিস। সেখান থেকেই…।”

আটের দশকের শেষ থেকে বাঙালীর ভাবনা-চিন্তা ও জীবনবোধে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। আর সেই পরিবর্তন বাঙালীকে এক অন্য বাঙ্গালীরূপে উপস্থাপন করে। গিটার হাতে একজন বাঙালীও যে স্টেজ কাঁপাতে পারে, নিজের সময়ের কথা এভাবেও তুলে ধরতে পারে সেই ট্রেন্ড প্রথম চালু করেন ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গৌতম চট্টোপাধ্যায়। গানের জগতের সৃষ্টি হওয়া সেই নতুন আঙ্গিক থেকে সুমনদের অতিক্রম করে পরবর্তী সময়ে শিলাজিৎ-এর এই গান বাংলা গানে একটা মাইলস্টোন।

নিন্দুকেরা বা অনেক সমালোচকরা যতই শিলাজিৎ-এর গান নিয়ে নাক শিটকাক না কেন মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতারা কিন্তু অন্য কথা বলে। শিলাজিৎ মানেই নতুন কিছু। শিলাজিৎ মানেই চমক। গানের ফর্ম ভেঙে নতুন ফর্ম নিয়ে আবার এক্সপেরিমেন্ট।

একটা গান তৈরির পিছনে অনেক গল্প থাকে। ‘ঝিন্টি’ গানটার এরকমই একটা গল্প শোনাই শিলাজিৎ-এর মুখ থেকে, “আমি আর আবলুদা কালীঘাটের একটা গলিতে নির্জন দুপুরে কাক ধরতে বেরিয়েছিলাম। মানে কাকের গলা রেকর্ড করবো বলে। ‘ঝিন্টি’ গানটাতে ব্যবহার করবো। আবলুদার হাতে মিনি রেকর্ডার, কানে হেডফোন। একটা কাকও ডাকে না। অবশেষে কানে পড়লো কাকের ডাক। একটা বাড়ির কার্নিশে বসে আমার প্রিয় পক্ষী তারস্বরে ডাকছে। চুপিসাড়ে আবলুদা পৌঁছে গেল কাকের কাছে। রেকর্ডার অন। কাকও তখন টেক দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। বিভিন্নভাবে ডাকতে থাকলো সে। কখনও বিরক্ত হয়ে কখনও আদুরি গলায়। আবলুদার চোখ-মুখ চিকচিক করে উঠলো। বুঝলাম অপারেশন সাকসেসফুল। কাক উড়ে গেল। আবলুদা রিওয়াইন্ড করে প্লে করলো। করেই হঠাৎ ভুরু কুঁচকে উঠলো। বললাম, কী হল? এগিয়ে এসে হেডফোনটা আমার কানে দিতেই পরিষ্কার হয়ে গেল ঘটনাটা। রেকর্ড করা কাকের ডাক চালাতেই শুনলাম, পাশের বাড়ির টিভি সেট থেকে আসা ‘জন্মভূমি’ বরবাদ করে দিয়েছে আমাদের চেষ্টাকে। সঙ্গে একটা টিউবওয়েল থেকে জল তোলার আওয়াজও না চাইতেই জল ঢেলে দিয়েছে আমাদের প্রচেষ্টাতে। সেদিন বুঝেছিলাম মাইক্রোফোন আর কান এক জিনিস নয়।”

আজ এতগুলো বছর পরেও শিলাজিৎকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, ঝিন্টি আসলে? উত্তরটা অ্যাস ইউস্যুয়াল “আসলে ঝিন্টি বলে রক্ত-মাংসের কেউ নেই। ঝিন্টি আদতে একটা প্রোপোজাল।” পুরো গানটা জুড়ে কখনও ঝিন্টিকে ডাকা হয়েছে মিঠে রোদ্দুর, কখনও ঝোড়ো হাওয়া যেভাবেই হোক। আসলে প্রেমের বোধ হয় কোনো ফর্ম বা শেপ হয়না। তাই শুধু প্রিয় মানুষের কাছে চলে আসাটাই শেষ কথা। গানের কথায় ‘তুই ছাড়া মিথ্যে এ গান গাওয়া।’ প্রেম বোধ এমনই হয়, তাই হয়তো শ্রোতারা এত ভালোভাবে রিলেট করতে পেরেছেন আজও পারেন। জীবনে তো জটিলতা থাকবেই। এই গানে বলা হয়েছে ‘জীবনের যত জটিল কুটিল ফ্যাক্টার x=প্রেম ধরে নিয়ে কষব।’ এই গভীর জীবনবোধকেও তো অস্বীকার করা যাবেনা। আসলে প্রেম ছাড়া বোধ হয় জীবন সত্যিই স্বাদহীন। তাই তো এই গানেই শিলাজিৎ বলে ওঠেন, ‘ঝিন্টি তুই নেই তাই কোনো স্বাদ নেই’। প্রেমের যে কত ডাইমেনশন থাকতে পারে তার ঠিক নেই। এই গানে যে খুঁজে চলার আকুতি আছে, জীবনবোধের নির্যাস আছে তাই তো শ্রোতাকে মুগ্ধ করে।

Facebook Comments