কীভাবে ‘আইটেম সং’ হল হিট সিনেমার রেসিপি

সুমন্ত দেবনাথ ||

এখনকার সিনেমা মানে সেখানে একটা জিনিস মাস্ট। সেটা না হলে টোটাল প্যাকেজটাই কেমন নুন ছাড়া তরকারির মত। বলুন তো কীসের কথা বলছি? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন আইটেম সং। বলিউড থেকে এই ট্র্যাডিশন এখন বাংলা সিনেমাতেও জুড়ে বসেছে। সিনেমার প্রোমোশনে গানের ভুমিকা প্রচুর। আর আইটেম সং এখনকার সিনেমার প্রোমোশনে একটা বিরাট ফ্যাক্টার।

কলকাতার সিনেমাশিল্পের যখন হাবুডুবু অবস্থা, তখন সেখানে সিনেমার ভেতর আমদানি হয়েছিল অদ্ভুত গান ও নাচের বিচিত্র সব আইটেম! অবস্থা বেগতিক দেখে অঞ্জন দত্ত তো গেয়েই ফেললেন একটি গান, ‘প্রযোজক শুধুই একটাই কথা বারবার বলে যান, “একটা দুষ্টু গান ঢোকান না দাদা, দুষ্টু গান ঢোকান।” শুধু কলকাতা কেন, পুরো ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমাশিল্পের চিত্র এখন এমনই। সংগীত ও নৃত্যপ্রিয় ভারতীয় ও বাংলাদেশি দর্শকের কাছে সিনেমা ‘হিট’ করাতে অ্যাপিলিং আইটেম সং-এর চেয়ে সহজ তরিকা আর নেই। কিন্তু আইটেম গান আসলে কী বস্তু?

ইন্টারনেটের দুনিয়া ঘেঁটে কিংবা চলচ্চিত্র বিষয়ক মোটা মোটা বই পড়েও ‘আইটেম গান’ কিংবা ‘আইটেম গার্ল’-এর সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে এখনকার দিনে হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোনো বিষয় নয়, আইটেম সং-এর আছে পুরোনো ইতিহাস। ইন্ডিয়ান ফিল্মেই ‘আইটেম সং’ ব্যাপারটা প্রথম আসে। এ এমন এক গান, যার সঙ্গে সিনেমার সরাসরি কোনো যোগসূত্র না থাকলেও অবাক হবার কিছু নেই। এই গানে ছবির গল্পের মোড় ঘুরবে না, গানে অংশ নেওয়া শিল্পীদের সরাসরি সম্পর্ক থাকবে না মূল গল্পের সঙ্গে। এ যেন একঘেয়েমি দূর করতে একটু স্থূল মাত্রার বিনোদন। আর আইটেম গার্ল হবেন তাঁরাই, যাঁরা অভিনয়ের বদলে শরীরী ভাষা আর অভিব্যক্তির মাধ্যমে নাচবেন। এখানে কোনো যুক্তি খাটাতে গেলে মুশকিল। কারো কারো মতে একটা বিষয় যেখানে শুধু একটাই শব্দ প্রযোজ্য ‘জাস্ট চিল’।

এবার একটু চোখ রাখা যাক ইতিহাসের পাতায়। দেখা যাক কোথা থেকে এলো আইটেম সং-আইটেম গার্ল। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস ঘেঁটে প্রথম আইটেম-গার্ল হিসেবে পাওয়া যায় কাক্কুকে। পুরো নাম কাক্কু মোরে। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এই নৃত্যশিল্পীকে বলা হতো ‘রাবার গার্ল’। তিনি ছিলেন নামী এক ক্যাবারেট নৃত্যশিল্পী। কাক্কু যেমন নাচতেন, তেমনি ছিল তাঁর সৌন্দর্য। কিন্তু পিছিয়ে ছিলেন অভিনয়ে। তাই চলচ্চিত্রে তিনি থেকে যান একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবেই। ১৯৪৮ সালের ছবি ‘আনোখি আদা’তে কাক্কুকে দেখা যায় আইটেম গার্ল হিসেবে। সেই ছবিতে তিনি একটি গানে আবির্ভূত হন, নাচেন, গান করেন। কিন্তু ছবির গল্পের লিখিত প্লট যদি কেউ পড়েন, তাহলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন, তাঁর কোনো অংশেই উল্লেখ নেই কাক্কুর সেই গান কিংবা নাচের কথা। উল্লেখ নেই ছবিতে কাক্কুর চরিত্রটি নিয়েও।

কাক্কুর দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন হেলেন, বলিউডের ‘আইটেম রানি’। কাক্কুই হেলেনকে পরিচয় করিয়ে দেন বলিউডের সঙ্গে। বলিউডে ‘আইটেম গান’-এর মূলধারা মূলত তাঁকে দিয়ে শুরু। হেলেনের অভিনয়ের কথা হয়তো কেউ সহজে মনে করতে পারবে না। কিন্তু তাঁর সেই ‘মনিকা, ও মাই ডার্লিং!’, ‘ইয়ে মেরা দিল’ কিংবা ‘মেহবুবা ও মেহবুবা’ গানগুলো তো বলিউডে ইতিহাস! হেলেন অভিনীত সেই গানগুলোকে পুঁজি করে এখনো অনেক নাচের আসর জমে ওঠে। হেলেনের পর আরও অনেকেই আইটেম গার্ল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চেয়েছিলেন বিভিন্ন সময়, যাঁদের মধ্যে আছেন বিন্দু, অরুণা ইরানিদের মতো শিল্পীরা। কিন্তু হেলেনের মাইলস্টোন তাঁরা ছুঁতে পারেননি কেউ। শেষমেশ হেলেনের উত্তরসূরি হলেন তাঁরই ছেলের বউ মালাইকা অরোরা খান। দিল সে ছবির ‘ছাইয়া ছাইয়া’ দিয়ে মালাইকা শুরু করলেন একবিংশ শতাব্দীতে আইটেম সং-এর নতুন ধারা।

কাক্কু ও হেলেনের পর বলিউডে মালাইকাকেই পুরোদস্তুর আইটেম গার্লের তকমাটি দিতে হবে। ‘ছাইয়া ছাইয়া’ দিয়ে শুরু করে সবশেষ ‘মুন্নি’-তে এসেও এ খান-পত্নী ক্ষান্ত হননি। অভিনেত্রী হিসেবে কখনোই নয়, নিজেকে ‘আইটেম-গার্ল’ হিসেবেই তুলে ধরেছেন সবার সামনে। বিংশ শতাব্দীতে মালাইকার পথ অনুসরণ করেছেন রাখি সাওয়ান্ত, ‘বাবুজি’ গানের ইয়ানা গুপ্ত কিংবা ‘কাটা লাগা’ গানের শেফালি জরিওয়ালারা। কিন্তু মালাইকার উচ্চতায় কেউ পৌঁছাতে পারেননি। তাঁদের নাচ নিয়ে কথা ওঠে বিভিন্ন সময়ে। বলা হয়ে থাকে, এঁদের পরিবেশনা শুধুই অশ্লীলতাকে উসকে দিয়েছে। এর বাইরে এই আইটেম-গার্লদের আর কোনো অবদান ছিল না বলিউডে। সম্প্রতি তাঁদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন পর্ণস্টার সানি লিওনও। সম্প্রতি টলিউডে স্বপন সাহার একটি সিনেমাতেও আইটেম সং-এ দেখা যাবে সানি লিওনকে।

হেলেন, বিন্দু, অরুণা ইরানিদের পর্দায় দেখা যেত ‘বার ড্যান্সার’ কিংবা খলনায়কের সঙ্গিনীর ভূমিকায়। তাই একটা সময় বলা হতো, আইটেম গান ‘ভালো মেয়েদের’ জন্য নয়। কিন্তু সেই স্টেরিওটাইপ বা ধরাবাঁধা ভাবনা ভেঙে দিলেন সত্তর-আশি দশকের বলিউড সুন্দরীরা। জিনাত আমান, পারভিন ববি ও রেখার মতো মূল নায়িকারা অংশ নিলেন আইটেম গানে। সেই থেকে চালু হয়ে গেল আইটেম সং-এ স্টার অভিনেত্রীদের অংশগ্রহণ। যেমনটা দেখা গিয়েছিল তেজাব ছবিতে মাধুরী দীক্ষিতকে ‘এক দো তিন’ গানে, খলনায়ক ছবিতে ‘চোলি কে পিছে’ গানে কিংবা মিস্টার ইন্ডিয়া ছবিতে শ্রীদেবীকে ‘হাওয়া হাওয়াই’ গানে। তা ছাড়া একেবারে খাঁটি আইটেম-কন্যা হিসেবে মূলধারার নায়িকারা নাম লেখাতে শুরু করেন তখন থেকেই। শিল্পা শেঠি, ঊর্মিলা মাতন্ডকার, রাভিনা ট্যান্ডন থেকে শুরু করে হালের ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, কারিনা কাপুর, ক্যাটরিনা কাইফ, সোনাক্ষী সিনহার নামও সেই তালিকায় এসে যায়।



আইটেম সং নিয়ে কটু কথা অনেক, কিন্তু এর ইতিবাচক দিকও খুঁজে বের করেছেন বলিউডের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ কোমল নাহতা ও তরণ আদর্শ। তাঁদের মতে, আইটেম সং-এর সঙ্গে ব্যবসায়ের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। আইটেম গান ছবির জৌলুশ অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। একটা আইটেম সং-এর ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে ছবির গানের অ্যালবাম বিক্রি, প্রোমোশন থেকে পাওয়া আয় সহ আরও অনেক বিষয়।

একটি সফল আইটেম সং একজন অভিনেত্রী কিংবা আইটেম-গার্লকে কোটি কোটি টাকার মালিক করে দিতে পারে। এক ‘শিলা’ কিংবা ‘মুন্নি’র গানে নেচে প্রতিবছর নায়িকারা হয়ে যান লাখ থেকে কোটিপতি। নিজেদের আইটেম সং-এর সঙ্গে বিভিন্ন ‘প্রাইভেট’ আর ‘পাবলিক’ পার্টিতে নেচে ঘরে লক্ষ্মী তুলে নিচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে আইটেম গান কিন্তু মন্দ কিছু নয়!

সিনেমায় দর্শক টানতে বর্তমানে একটা বড় ভূমিকা পালন করে আইটেম গান ‍আর তারই সাথে ‍আবেদনময় নাচ। ক্যাবারে ডান্স টলিউডের অনেক বাংলা সিনেমাতেই দেখা গেছে। কিন্তু নির্ভেজাল আইটেম ড্যান্স, তা বোধহয় বিংশ শতাব্দীর আগে চোখে পড়েনি। আর এখন তো টলিউডের বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমার নামী হিরোইনরাও আইটেম ড্যান্সে দেখা দিচ্ছেন। বলিউডের মতই টলিউডেও এন্ট্রি পাক্কা করেছে হার্ডকোর আইটেম সং। আইটেম-গার্লের শর্ট ড্রেস, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, গানের অরুচিকর কথা ও ইঙ্গিতপূর্ণ সুরের সেই গানগুলো দেখে মনে হবে পুরোনো কাসুন্দি ফিরে এসেছে নতুন বোতলে! এখনকার অনেক পরিচালক তো মনেই করেন, আইটেম সং না থাকলে সিনেমাটাই ঠিকঠাক দাঁড়াবে না।

একটু অন্য ঘরানার ছবি করেন এমন অনেক পরিচালকই অবশ্য বলেন, “আইটেম সং হচ্ছে সস্তা বিনোদনের চকচকে মোড়কিকরণ, এটা এক শ্রেনীর দর্শকদের আগ্রহী করার জন্যই করা হচ্ছে।”

চলচ্চিত্রে কেন এই আইটেম সং? একজন স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালককে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, “চলচ্চিত্র পরিবেশকরা হল মালিকদের দোহাই দিয়ে শুরুতেই প্রযোজক বা পরিচালককে প্রশ্ন করেন, সিনেমায় আইটেম সং আছে কিনা। তারপর প্রশ্ন করেন, আর্টিস্ট কে আছেন। হল মালিকদের প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, আইটেম সং না থাকলে দর্শক হলে আসেন না। আমরা কি করতে পারি।”

সত্যি বলতে এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই এই ধরনের গানের অস্থিত্ব ছিল। বিশেষ ভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রে। অতি আনন্দে বা দুঃখে নায়ক বা খল নায়ক , রাজা, বা ডাকাত বাইজি বাড়িতে যেতেন বা রক্ষিতার কাছে যেতেন। সেখানে নাচ গান হত গল্প কিংবা দৃশ্যের প্রয়োজনে এবং তা উপস্থাপন করা হত নান্দনিক ভাবে। বর্তমান আইটেম গান গল্পের প্রয়োজন ছাড়াই শুধুমাত্র অশ্লীল বিনোদনের জন্য।

কিন্তু অশ্লীলতার ভূত আমাদের সিনেমার ঘাড় থেকে নামানো সম্ভব হয়নি। অশ্লীল সময়ের সকল অশ্লীলতা ককটেল বানিয়ে পরবর্তি সময়ে আইটেম সং নাম দিয়ে তার মধ্যে উপস্থাপন করতে শুরু করলেন আমাদের প্রযোজক পরিচালকরা। যে কারনে কোন কোন চলচ্চিত্র মান সম্পন্ন হলেও শুধুমাত্র ওই আইটেম সং-এর কারনে পরিবারের সবাই একসাথে সিনেমাটি দেখতে পারেনা।

সিনেমা একটি জাতির বা দেশের আর্থ সামাজিক, সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। আর এই সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক প্রযোজক, পরিবেশক সর্বোপরি দর্শকের। এই প্রসঙ্গে উপমহাদেশের এক বিখ্যাত পরিচালকের সেই কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত এবং এমনটাই কাম্য “বিনোদন যদি চলচ্চিত্রের মূল লক্ষ হয়, একজন দর্শক তখনই একটি চলচ্চিত্র দেখে বিনোদিত হবেন যখন একটি সুন্দর গল্পের ভালো চিত্রনাট্য হবে, নির্মাতার দক্ষতা আর অভিনয় শিল্পীর মুন্সিয়ানায় কাহিনীটি জীবন্ত হয়ে দর্শকের মনে দোলা দেবে।

Facebook Comments